পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী **মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে** তীব্র আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী **শুভেন্দু অধিকারী**। বাঁকুড়ার মেজিয়ায় শ্যাম স্টিলের সম্প্রসারণ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি একদিকে যেমন রাজ্যে নতুন শিল্প বিনিয়োগের আশ্বাস দেন, অন্যদিকে পূর্বতন সরকারের শিল্পনীতি নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং বহু শিল্পপতি নতুন করে রাজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর শিল্পমহলের আস্থা বেড়েছে এবং আগামী দিনে আরও বড় বিনিয়োগ আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে বলেন, শ্যাম স্টিলের আধুনিক কারখানা একবার ঘুরে দেখতে আসা উচিত। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, **“আপনার হাতে অনেক সময় আছে। প্ল্যান্টের ভিতরে এসে দেখে যাবেন। সরকারি হেলিকপ্টার পাঠিয়ে দেব।”** এই মন্তব্যকে ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, অতীতে শিল্পপতিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের কারণে পশ্চিমবঙ্গ বহু বিনিয়োগের সুযোগ হারিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীকে নিরুৎসাহিত করা হত এবং বহিরাগত তকমা দেওয়া হত। বর্তমানে সেই পরিস্থিতি বদলেছে বলেই শিল্পপতিরা আবার পশ্চিমবঙ্গমুখী হচ্ছেন বলে তাঁর দাবি।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাজ্যে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সংগ্রহ, রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল এবং অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরিতে সরকার সক্রিয় ভূমিকা নেবে। বড় শিল্প প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোরও আশ্বাস দেন তিনি। তাঁর কথায়, **১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শিল্পপতিদের আর আলাদা করে বিভিন্ন পঞ্চায়েত বা পুরসভার অনুমতির জন্য ঘুরতে হবে না।** সরকার দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করবে।
শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, নতুন শিল্পনীতি বাস্তবায়নের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। শ্যাম স্টিলের সম্প্রসারণ প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেন।
তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সুরও ছিল স্পষ্ট। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শিল্পের পরিবর্তে রাজনৈতিক বাধা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বহু বিনিয়োগকারী অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি বদলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে, শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। শাসক ও বিরোধী উভয় শিবির থেকেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সামনে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পায়নকে সামনে রেখে রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে মতপার্থক্য আগামী দিনেও রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে থাকবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজ্যের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেই লক্ষ্য পূরণে বিনিয়োগের পাশাপাশি দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, মেজিয়ার শিল্প প্রকল্পের উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে যেমন শিল্পায়নের রূপরেখা উঠে এসেছে, তেমনই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে তাঁর মন্তব্যও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আগামী দিনে এই শিল্প প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন এবং সরকারের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর থাকবে শিল্পমহল ও সাধারণ মানুষের।


