পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তন হলে সাধারণ মানুষের জন্য চালু করা হবে **‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা’**, যার আওতায় প্রত্যেক যোগ্য পরিবারকে বছরে **৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমা কভার** দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর এই ঘোষণা প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের বহু সাধারণ মানুষ এখনও উন্নত চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খান। সরকারি হাসপাতালের উপর চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতেই নতুন স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালুর পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেন।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে এমন একটি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু করা হবে, যেখানে একটি পরিবারের সদস্যরা বছরে সর্বোচ্চ **৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা** পাবেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের চিকিৎসার আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
বিরোধী দলনেতা আরও দাবি করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিষেবা দেওয়া হবে। তাঁর মতে, দেশের অন্যান্য রাজ্যে ইতিমধ্যেই উচ্চ অঙ্কের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু রয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের সুবিধা চালু করা সম্ভব।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণা বর্তমানে একটি **নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি**, কারণ পশ্চিমবঙ্গে এখনও বিজেপি সরকার গঠন করেনি। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের ফলাফলের উপর। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এই নামে কোনও সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু হয়নি।
অন্যদিকে, রাজ্যের বর্তমান সরকার ইতিমধ্যেই **স্বাস্থ্যসাথী** প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পরিবারকে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা দিয়ে আসছে। এই প্রকল্পে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী পরিবারগুলি বিভিন্ন সরকারি ও তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে ক্যাশলেস চিকিৎসার সুযোগ পান। ফলে শুভেন্দু অধিকারীর নতুন ঘোষণাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যসাথী বনাম সম্ভাব্য নতুন স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প নিয়েও রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কোনও রাজ্যে উচ্চ অঙ্কের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু করতে হলে পর্যাপ্ত বাজেট, হাসপাতালের পরিকাঠামো, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বিমার অঙ্ক বাড়ালেই হবে না, সেই সুবিধা যাতে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমা কভার প্রদান করতে গেলে সরকারের উপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই প্রকল্পের অর্থায়ন, উপভোক্তা নির্বাচন, হাসপাতালের তালিকা এবং পরিষেবার পরিধি—এই সমস্ত বিষয় আগে থেকেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের কর্মসূচি তুলে ধরছে। শুভেন্দু অধিকারীর এই ৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যবিমার প্রতিশ্রুতিও সেই রাজনৈতিক কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন সাধারণ মানুষের নজর থাকবে ভবিষ্যতে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব রূপ পায় এবং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি স্বাস্থ্য খাতে আরও কী কী নতুন ঘোষণা করে। তবে বর্তমানে এই প্রকল্পটি একটি ঘোষিত প্রতিশ্রুতি, সরকারি প্রকল্প হিসেবে এখনও কার্যকর হয়নি।—


