দেশের সোনার বাজারে ফের ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রবণতা দেখা গেল। কয়েকদিনের স্বস্তির পর আবারও বেড়েছে হলুদ ধাতুর দাম, যার ফলে নতুন করে গয়না কেনার পরিকল্পনা করা সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিশেষ করে বিয়ের মরশুম, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবের আগে সোনার দাম বাড়ায় বাজারে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওঠানামা, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সুদের নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি ভারতের সোনার বাজারে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ (Safe Haven Asset) হিসেবে সোনার চাহিদা আবার বেড়েছে। তারই প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশীয় বাজারেও।
শনিবার প্রকাশিত বাজারদর অনুযায়ী, **২২ ক্যারেট এবং ২৪ ক্যারেট—উভয় ধরনের সোনার দামেই বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।** ফলে গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ গয়না কিনতে ক্রেতাদের কিছুটা বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিভিন্ন শহরে কর, জিএসটি এবং মেকিং চার্জের কারণে দামে সামান্য পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে সারা দেশেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে।
বাজার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আজ **২৪ ক্যারেট ১০ গ্রাম সোনার দাম প্রায় ₹১ লক্ষ ১ হাজার টাকার কাছাকাছি**, অন্যদিকে **২২ ক্যারেট ১০ গ্রাম সোনার দাম প্রায় ₹৯৩ হাজার টাকার আশেপাশে** ঘোরাফেরা করছে। যদিও শহরভেদে কয়েকশো টাকার পার্থক্য দেখা যেতে পারে। তাই সোনা কেনার আগে স্থানীয় জুয়েলার্সের কাছ থেকে সর্বশেষ দর যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শুধু আন্তর্জাতিক বাজার নয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও দামের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। বিয়ের মরশুম, অক্ষয় তৃতীয়া, ধনতেরাস কিংবা দুর্গাপুজোর মতো উৎসবের আগে সোনার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। চাহিদা বৃদ্ধি পেলেই বাজারে দামের উপর চাপ তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে বহু বিনিয়োগকারী শেয়ার বাজারের পরিবর্তে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে সোনার দাম শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ভারত যেহেতু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা আমদানিকারক দেশ, তাই আন্তর্জাতিক দামের পরিবর্তন দ্রুত দেশীয় বাজারেও প্রতিফলিত হয়।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের মতে, অনেক ক্রেতাই দাম আরও বাড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই সোনা কিনে রাখছেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ আবার দাম কিছুটা কমার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে সোনা এখনও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বিনিয়োগকারী এবং গয়না ক্রেতা—উভয়ের কাছেই সোনার গুরুত্ব আগের মতোই রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সোনা কেনার সময় শুধুমাত্র দামের দিকে নজর দিলেই চলবে না। অবশ্যই **BIS Hallmark**-যুক্ত গয়না কিনতে হবে এবং বিল সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি মেকিং চার্জ, জিএসটি এবং অন্যান্য অতিরিক্ত খরচ সম্পর্কেও আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা নেওয়া উচিত। এতে ভবিষ্যতে কোনও সমস্যার সম্ভাবনা কমে যায়।
অন্যদিকে, যারা ডিজিটাল গোল্ড, গোল্ড ETF বা সার্বভৌম গোল্ড বন্ডের মতো বিকল্প বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, তাঁদেরও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা। কারণ সোনার বাজারে স্বল্পমেয়াদে ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি এখনও অন্যতম নির্ভরযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে, সোনার দাম আবার বাড়ায় সাধারণ ক্রেতাদের খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনই বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাই আগামী কয়েকদিন আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধির উপর নজর রাখাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


