পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলিকে কেন্দ্র করে ফের সরব হলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সাম্প্রতিক এক জনসভা ও সাংবাদিক বৈঠকে তিনি সরকারি হাসপাতালগুলির পরিষেবা, প্রশাসনিক কার্যকলাপ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। একই সঙ্গে তিনি বড় ঘোষণা করে জানান, সাধারণ মানুষের স্বার্থে হাসপাতালগুলির পরিস্থিতি নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে বিজেপি এবং প্রয়োজনে আইনি পথেও হাঁটা হবে।
শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, রাজ্যের একাধিক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবার মান ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ, পরিকাঠামোর অভাব এবং রোগীদের দুর্ভোগ—এই সমস্ত বিষয় নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষ করের টাকা দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা পেলেও বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে সেই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিরোধী দলনেতার বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালগুলিতে ওষুধের ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্যায় প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী সমস্যার মুখে পড়ছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারের প্রচারের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি করা হলেও মাটির স্তরে বহু সমস্যা এখনও রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য বিজেপির পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিনিধি দল গঠন করা হবে। সেই দল হাসপাতালগুলিতে গিয়ে রোগী ও তাঁদের পরিবারের বক্তব্য সংগ্রহ করবে। পাশাপাশি কোথাও অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হবে। তাঁর দাবি, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে কোনও রাজনৈতিক আপস করা উচিত নয়। মানুষের জীবন ও চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে কোনও রকম অব্যবস্থাপনা বরদাস্ত করা হবে না।
শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাসপাতালের উন্নয়নের নামে বরাদ্দ অর্থের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবিও তিনি জানান। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলিতে নিয়োগ, সরঞ্জাম কেনা এবং পরিষেবা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, শাসকদলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। নতুন মেডিক্যাল কলেজ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন বলেও তাঁদের দাবি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, স্বাস্থ্য পরিষেবা বরাবরই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তাই সরকারি হাসপাতাল নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর এই নতুন কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী দিনে বিষয়টি নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে আরও তীব্র বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বিরোধীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলিও যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সমস্যা থাকলে তার দ্রুত সমাধান করা যায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণার পর স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। একদিকে বিজেপি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি তুলছে, অন্যদিকে রাজ্য সরকার নিজেদের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরছে।
সব মিলিয়ে, সরকারি হাসপাতাল নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর এই বড় ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী দিনে বিজেপির ঘোষিত কর্মসূচি কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং রাজ্য সরকার এই অভিযোগগুলির কীভাবে জবাব দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।


