নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথিত চিতাভস্ম জাপান থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবিতে দায়ের হওয়া মামলায় এবার কেন্দ্রের জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নোটিস জারি করেছে। বেঞ্চে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনা। মামলাটি দায়ের করেছেন নেতাজির কন্যা অনিতা বোস ফাফ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত নেতাজির কথিত দেহাবশেষ বা চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন।
এই মামলার ফলে নেতাজির অন্তর্ধান এবং তাঁর কথিত দেহাবশেষকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ফের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে নেতাজির অন্তর্ধানের পর থেকেই তাঁর শেষ পরিণতি নিয়ে নানা মত ও তত্ত্ব সামনে এসেছে। একটি বহুল আলোচিত মত অনুযায়ী, তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনার পর তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর দেহাবশেষ পরে টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত হয়। তবে এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
### সুপ্রিম কোর্টে কী হয়েছে?
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি ওঠে। নেতাজির কন্যা অনিতা বোস ফাফের হয়ে প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি আদালতে সওয়াল করেন। তাঁর পক্ষ থেকে বলা হয়, নেতাজির কথিত চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কেন্দ্রের কাছ থেকে একটি চূড়ান্ত, যুক্তিসঙ্গত এবং সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
এরপর আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই বিষয়ে জবাব চেয়ে নোটিস জারি করে। অর্থাৎ, শীর্ষ আদালত এখনও নেতাজির কথিত দেহাবশেষ ভারতে ফেরানোর নির্দেশ দেয়নি। বরং কেন্দ্রের অবস্থান এবং এ বিষয়ে সরকারের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রের জবাবের ভিত্তিতে মামলাটি আরও এগোতে পারে।
### কে করেছেন এই আবেদন?
এই আবেদনকারীর পরিচয়ও মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আবেদনকারী অনিতা বোস ফাফ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কন্যা। তিনি বহু বছর ধরে জাপানে সংরক্ষিত কথিত চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করার পক্ষে সওয়াল করেছেন।
আবেদনে তাঁর বক্তব্য, নেতাজির কথিত দেহাবশেষ দীর্ঘ সময় ধরে জাপানের রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁর দাবি, ভারত সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া।
### রেনকোজি মন্দির কেন গুরুত্বপূর্ণ?
টোকিওর রেনকোজি মন্দির দীর্ঘদিন ধরেই নেতাজির কথিত চিতাভস্মের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনার পর নেতাজির দেহাবশেষ জাপানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে রেনকোজি মন্দিরে তা সংরক্ষিত হয়।
তবে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে বহু বছর ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তিনি সত্যিই ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন কি না, তাঁর দেহাবশেষের পরিচয় কতটা নিশ্চিত এবং সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ কী ছিল—এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক তদন্ত ও গবেষণা হয়েছে।
ফলে রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্মকে ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে নেতাজির ইতিহাস, উত্তরাধিকার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে।
### নেতাজির শেষ পরিণতি নিয়ে বিতর্ক
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ১৯৪৫ সালের আগস্টে তাঁর অন্তর্ধানের পর থেকেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা তত্ত্ব তৈরি হয়েছে।
একটি সরকারি তদন্তে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। আবার দীর্ঘদিন ধরে এমন মতও রয়েছে যে তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি। এই বিতর্কের কারণেই তাঁর কথিত দেহাবশেষের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন থেকে গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অনিতা বোস ফাফের আবেদন নতুন করে সেই পুরনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও বর্তমান মামলার মূল প্রশ্ন হল—জাপানে সংরক্ষিত নেতাজির কথিত চিতাভস্ম দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কেন্দ্র কী সিদ্ধান্ত নেবে।
### পরিবারের পক্ষ থেকে কেন দেশে ফেরানোর দাবি?
অনিতা বোস ফাফের বক্তব্য অনুযায়ী, নেতাজির কথিত দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করা উচিত। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে জাপানে সংরক্ষিত থাকার পর এবার এই অধ্যায়ের একটি চূড়ান্ত পরিণতি হওয়া প্রয়োজন।
তিনি নিজেকে নেতাজির সরাসরি জীবিত উত্তরাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করে এই দাবি জানিয়েছেন। তাঁর আবেদনের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, নেতাজির শেষকৃত্য যেন তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করা যায়।
### কেন্দ্রের অবস্থান এখন গুরুত্বপূর্ণ
সুপ্রিম কোর্টের নোটিসের পর কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারকে আদালতের সামনে জানাতে হবে, জাপানে সংরক্ষিত নেতাজির কথিত চিতাভস্ম দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী।
এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক নথি, পূর্ববর্তী তদন্তের রিপোর্ট, জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং দেহাবশেষের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কেন্দ্রের জবাব পাওয়ার পর আদালত মামলাটির পরবর্তী দিক নির্ধারণ করতে পারে।
### শুধু আবেগ নয়, রয়েছে ঐতিহাসিক প্রশ্নও
নেতাজিকে ঘিরে যে কোনও সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রবল আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা এবং আজাদ হিন্দ বাহিনীর নেতৃত্ব তাঁকে ভারতীয় ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
তাই তাঁর কথিত দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি সাধারণ মানুষের কাছে আবেগের বিষয় হলেও, সরকারের কাছে এটি একটি জটিল ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক বিষয়ও হতে পারে।
দেহাবশেষের পরিচয়, পূর্ববর্তী তদন্তের ফল এবং জাপানের অবস্থান—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
### জাপানের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ
রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত কথিত চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনতে হলে জাপানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ বিষয়টি সরাসরি জাপানের মাটিতে সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত।
ভারত ও জাপানের মধ্যে বর্তমানে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে দুই দেশের সরকারি স্তরে আলোচনা হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে আদালত মূলত কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। জাপানের সঙ্গে কোনও নতুন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আদালতের বর্তমান নির্দেশে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
### পরবর্তী শুনানির দিকে নজর
এখন মামলার পরবর্তী ধাপে কেন্দ্রের জবাবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কী তথ্য আদালতের সামনে তুলে ধরে এবং নেতাজির কথিত চিতাভস্ম দেশে ফেরানোর বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটি দেখার বিষয়।
কেন্দ্রের জবাবের পর আদালত প্রয়োজনে অতিরিক্ত তথ্য বা নথিও চাইতে পারে। একই সঙ্গে আবেদনকারীর পক্ষ থেকেও আরও যুক্তি তুলে ধরা হতে পারে।
এই মামলার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন ফের দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে এসেছে।
### ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কি এবার নতুন মোড় নেবে?
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। তাঁর শেষ পরিণতি নিয়ে বিতর্ক স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও বারবার সামনে এসেছে। এবার তাঁর কন্যার আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রের কাছে জবাব চাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আইনি গুরুত্ব পেল।
তবে আদালতের নোটিসকে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। এই পর্যায়ে আদালত শুধু কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রের জবাব এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশের ভিত্তিতেই মামলার গতিপথ স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথিত চিতাভস্ম জাপানের রেনকোজি মন্দির থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি এবার সুপ্রিম কোর্টের দরজায় পৌঁছেছে। নেতাজির কন্যা অনিতা বোস ফাফের আবেদনের পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নোটিস জারি করেছে। আবেদনকারীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জাপানে সংরক্ষিত নেতাজির কথিত দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করা উচিত। অন্যদিকে, নেতাজির মৃত্যু ও দেহাবশেষের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। ফলে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আপাতত কেন্দ্রের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই জবাবের পরই বোঝা যাবে, নেতাজির কথিত চিতাভস্ম দেশে ফেরানোর বিষয়ে সরকার কী অবস্থান নেয় এবং এই ঐতিহাসিক বিষয়ে আদালত পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ করে।


