জাপানের টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথিত চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবিতে এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলেন তাঁর কন্যা অনিতা বোস ফাফ। দীর্ঘদিন ধরে নেতাজির শেষ পরিণতি এবং তাঁর কথিত দেহাবশেষকে ঘিরে যে বিতর্ক চলে আসছে, সেই আবহেই সুপ্রিম কোর্টে এই আবেদন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনিতা বোস ফাফের আবেদনের মূল বক্তব্য, জাপানে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত থাকা তাঁর বাবার কথিত চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হোক। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়ার জন্যই শীর্ষ আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকেই নানা প্রশ্ন এবং মতভেদ রয়েছে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে একটি ঐতিহাসিক ও সরকারি বয়ান রয়েছে। সেই ঘটনার পর জাপানের রেনকোজি মন্দিরে যে দেহাবশেষ সংরক্ষিত রয়েছে, তা নেতাজিরই বলে একটি মত প্রচলিত। কিন্তু সেই পরিচয় নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
### সুপ্রিম কোর্টে কেন আবেদন?
নেতাজির কন্যার এই আবেদনের মূল লক্ষ্য হল জাপানে থাকা কথিত দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি করা হলেও বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
অনিতা বোস ফাফ মনে করেন, নেতাজির কথিত দেহাবশেষ দেশে এনে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তাঁর আবেদনের মাধ্যমে এবার সেই দাবিই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে এসেছে।
তবে এই আবেদনের অর্থ এই নয় যে সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই দেহাবশেষ দেশে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছে। আদালত প্রথমে কেন্দ্রের অবস্থান জানতে চাইতে পারে এবং বিষয়টির ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক দিক খতিয়ে দেখতে পারে।
### রেনকোজি মন্দিরে কী রয়েছে?
জাপানের টোকিও শহরের রেনকোজি মন্দিরের সঙ্গে নেতাজির কথিত দেহাবশেষের সম্পর্ক বহু দশকের পুরনো। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনার পর নেতাজির মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর দেহাবশেষ জাপানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষণ করা হয়।
তবে নেতাজির মৃত্যু নিয়ে সব মহল একই মত পোষণ করে না। কেউ কেউ বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বকে গ্রহণ করলেও অন্য একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছে যে নেতাজি ওই দুর্ঘটনায় মারা যাননি।
এই মতভেদের কারণেই রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত দেহাবশেষের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
### নেতাজির মৃত্যু নিয়ে এত বিতর্ক কেন?
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, পরে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছিল।
১৯৪৫ সালের আগস্টে তাঁর হঠাৎ অন্তর্ধান সেই ইতিহাসে এক রহস্যময় অধ্যায় তৈরি করে। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল—এই বক্তব্যের পক্ষে একাধিক তদন্তের রিপোর্ট রয়েছে। আবার সেই রিপোর্ট নিয়েও সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে।
নেতাজির শেষ পরিণতি নিয়ে এই দীর্ঘ বিতর্কই তাঁর কথিত দেহাবশেষকে ঘিরে বিষয়টিকে এত সংবেদনশীল করে তুলেছে।
### একাধিক তদন্ত হয়েছিল
নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে স্বাধীনতার পর একাধিক তদন্ত ও অনুসন্ধান হয়েছে। শাহনওয়াজ কমিটি, খোসলা কমিশন এবং পরে মুখার্জি কমিশন—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়।
প্রথম দিকের তদন্তে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর তত্ত্বকে সমর্থন করা হয়েছিল। তবে বিচারপতি এম কে মুখার্জি কমিশনের রিপোর্টে রেনকোজি মন্দিরের দেহাবশেষ নেতাজির নয় বলে মত দেওয়া হয়েছিল। যদিও তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার সেই রিপোর্টের সঙ্গে একমত হয়নি।
ফলে সরকারি অবস্থান এবং বিভিন্ন তদন্তের পর্যবেক্ষণের মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়।
### পরিবারের দাবি কী?
অনিতা বোস ফাফ দীর্ঘদিন ধরেই মনে করেন, তাঁর বাবার কথিত দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনা উচিত। তাঁর মতে, বিষয়টির একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
দেশের মাটিতে নেতাজির শেষকৃত্য সম্পন্ন করার দাবি শুধুমাত্র পারিবারিক আবেগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জাতীয় ইতিহাস এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা।
এই কারণেই তাঁর সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
### কেন্দ্রের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাপান থেকে কোনও ঐতিহাসিক দেহাবশেষ বা নিদর্শন ভারতে ফিরিয়ে আনতে হলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। রেনকোজি মন্দিরের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক নথি, দেহাবশেষের পরিচয় এবং পূর্ববর্তী তদন্তের রিপোর্টও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান এই মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি আদালতের সামনে দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও নির্দিষ্ট অবস্থান জানায়, তাহলে মামলার পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
### আদালতের সামনে ঐতিহাসিক প্রশ্নও
এই মামলাটি শুধুমাত্র একটি দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশাসনিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে নেতাজির মৃত্যুর ইতিহাসও সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে।
যদি রেনকোজি মন্দিরের দেহাবশেষকে নেতাজির বলে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তাঁর অন্তর্ধান সংক্রান্ত দীর্ঘ বিতর্কের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। আবার যদি পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে দেশে ফিরিয়ে আনার আগে সেই বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
### DNA পরীক্ষা কি হতে পারে?
নেতাজির কথিত দেহাবশেষের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে অতীতে DNA পরীক্ষার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে বহু দশক পুরনো দেহাবশেষ থেকে নির্ভরযোগ্য DNA পরীক্ষা করা কতটা সম্ভব, সেটিও একটি প্রযুক্তিগত প্রশ্ন।
এছাড়া সম্ভাব্য DNA নমুনার সঙ্গে তুলনা করার জন্য পরিবারের উপযুক্ত জেনেটিক নমুনা প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের পরীক্ষা বাস্তবে সম্ভব কি না, তা বিশেষজ্ঞদের মতামতের বিষয়।
তাই আদালত চাইলে বিষয়টির বৈজ্ঞানিক দিকও বিবেচনায় নিতে পারে।
### জাপানের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ
রেনকোজি মন্দির জাপানে অবস্থিত হওয়ায় বিষয়টির একটি আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক দিকও রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে যদি দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে জাপান সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারত ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কের প্রেক্ষিতে নেতাজির দেহাবশেষের মতো ঐতিহাসিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### কেন এখন আবার আলোচনায় নেতাজি?
নেতাজিকে ঘিরে মানুষের আবেগ আজও প্রবল। তাঁর জন্মদিন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা দিবস—বিভিন্ন জাতীয় উপলক্ষে তাঁর অবদান নতুন করে স্মরণ করা হয়।
এরই মধ্যে তাঁর কন্যার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন বিষয়টিকে আবার জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে বিষয়টি ওঠায় বহু বছর ধরে চলা বিতর্ক নতুন আইনি মাত্রা পেয়েছে।
### আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সুপ্রিম কোর্ট এই আবেদনে কী নির্দেশ দেয়। আদালত কেন্দ্রের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চাইতে পারে। প্রয়োজনে নেতাজির দেহাবশেষ সংক্রান্ত পুরনো তদন্তের রিপোর্ট এবং সরকারি নথিও আদালতের সামনে পেশ হতে পারে।
একই সঙ্গে আবেদনকারীর পক্ষ থেকেও তাঁদের দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক ও আইনি যুক্তি তুলে ধরা হবে।
তবে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জাপান থেকে নেতাজির কথিত চিতাভস্ম ভারতে ফিরছে—এমন কোনও দাবি করা যায় না।
### ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি কি সম্ভব?
নেতাজির অন্তর্ধান ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলির মধ্যে একটি। দীর্ঘ ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর মৃত্যু, বিমান দুর্ঘটনা এবং রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত দেহাবশেষ নিয়ে বিতর্ক চলছে।
অনিতা বোস ফাফের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন সেই পুরনো প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর দাবি যদি আদালত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং কেন্দ্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে নেতাজির কথিত দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার পথ খুলতে পারে।
তবে তার আগে ঐতিহাসিক সত্যতা, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, আইনি বিষয় এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া—সবকিছুই বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথিত চিতাভস্ম জাপান থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তাঁর কন্যা অনিতা বোস ফাফের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন বহু পুরনো একটি ঐতিহাসিক বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত দেহাবশেষকে নেতাজির বলে যে ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে, তা নিয়ে অতীতেও একাধিক তদন্ত হয়েছে। কিন্তু সেই তদন্তের ফলাফল নিয়েও সম্পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি। একদিকে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর সরকারি বয়ান রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর মৃত্যু ও দেহাবশেষের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে এসেছেন অনেকে। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের পক্ষ থেকে দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্যের দাবি করা হয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশ এবং কেন্দ্রের অবস্থানের উপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে। তবে এই পর্যায়ে বিষয়টিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার কোনও সুযোগ নেই। আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক যাচাই শেষ হওয়ার পরই নেতাজির কথিত দেহাবশেষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে।


