প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পরদিনই বড় রাজনৈতিক অবস্থান জানাল শিরোমণি অকালি দল বা SAD। শনিবার দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল ঘোষণা করেছেন, ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ায় দলটি সমর্থন জানাচ্ছে। একইসঙ্গে সংসদে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা **Women’s Reservation Bill** দ্রুত কার্যকর করার দাবিও জানিয়েছে অকালি দল। দলের এই অবস্থানকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। বিশেষ করে আগামী বছর পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি ও অকালি দলের মধ্যে ফের রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
শনিবার চণ্ডীগড়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সুখবীর বাদল সামাজিক মাধ্যমে দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, অকালি দল দেশে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর করার পক্ষে। একইসঙ্গে ডিলিমিটেশন বা লোকসভা কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সমস্ত রাজ্যের প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য বজায় রাখার দাবি জানিয়েছে দল। অকালি দলের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও একটি রাজ্য বা অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব যাতে ডিলিমিটেশনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
### ৫০ শতাংশ আসন বাড়ানোর প্রস্তাবে সমর্থনডিলিমিটেশন নিয়ে অকালি দলের অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল লোকসভায় আসন বৃদ্ধির প্রস্তাব। সুখবীর বাদল জানিয়েছেন, কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সমস্ত রাজ্যের লোকসভা আসন **সমানভাবে ৫০ শতাংশ বাড়ানোর** যে প্রস্তাব রয়েছে, তার প্রতি সমর্থন রয়েছে SAD-এর। অর্থাৎ, জনসংখ্যার ভিত্তিতে কোনও নির্দিষ্ট রাজ্যের আসন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর পরিবর্তে সমস্ত রাজ্যকে সমান হারে অতিরিক্ত প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার পক্ষে দলটি।
এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ডিলিমিটেশন নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে যেসব রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। ফলে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত ডিলিমিটেশন নিয়ে জাতীয় স্তরে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অকালি দলের ৫০ শতাংশ আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবে সমর্থন রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
### মহিলাদের সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকরের দাবি
ডিলিমিটেশনের পাশাপাশি মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়েও জোর দিয়েছে অকালি দল। সুখবীর বাদল জানিয়েছেন, **Women’s Reservation Bill** দ্রুত কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। সংসদ এবং রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এই সাংবিধানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অকালি দলের বক্তব্য, মহিলাদের সমান অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মহিলাদের অধিকার প্রসঙ্গে সুখবীর বাদল শিখ গুরুদের শিক্ষা এবং সমতার আদর্শের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার ঐতিহ্য থেকেই অকালি দল মহিলাদের সংরক্ষণের দ্রুত বাস্তবায়নকে সমর্থন করছে। পাশাপাশি শিরোমণি গুরদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি বা SGPC-তে মহিলাদের সংরক্ষণের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।
### মোদির সঙ্গে বৈঠকের পরেই বদল?
সুখবীর বাদলের এই ঘোষণা সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সঙ্গে কি এই অবস্থান পরিবর্তনের কোনও সম্পর্ক রয়েছে?
শুক্রবার সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন সুখবীর সিং বাদল। বৈঠকে পঞ্জাব সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বাদল জানিয়েছিলেন। তবে বিজেপির সঙ্গে অকালি দলের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোট নিয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি। কিন্তু বৈঠকের মাত্র একদিন পরই কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ডিলিমিটেশন এবং মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রস্তাবের পক্ষে অকালি দলের অবস্থান প্রকাশ্যে আসায় রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে।
বিজেপি এবং SAD একসময় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র ছিল। তবে কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি হয় এবং অকালি দল বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA থেকে বেরিয়ে যায়। পরে তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করা হলেও দুই দলের মধ্যে আগের মতো রাজনৈতিক সম্পর্ক আর তৈরি হয়নি। এখন পঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন এগিয়ে আসায় ফের বিজেপি ও অকালি দলের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
### বিজেপি-অকালি জোটের জল্পনা বাড়ছে
সুখবীর বাদলের সঙ্গে মোদির বৈঠক এবং তার পরদিন ডিলিমিটেশন ইস্যুতে SAD-এর সমর্থন—এই দুই ঘটনাকে পাশাপাশি দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। যদিও এখনও পর্যন্ত দুই দলের পক্ষ থেকে কোনও নতুন জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি, তবু রাজনৈতিক মহলে সম্ভাব্য BJP-SAD সমঝোতা নিয়ে জল্পনা তীব্র হয়েছে।
বিশেষ করে পঞ্জাবের রাজনীতিতে অকালি দলের নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। অন্যদিকে বিজেপিও রাজ্যে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে দুই দল যদি ভবিষ্যতে ফের একসঙ্গে আসে, তাহলে পঞ্জাবের নির্বাচনী সমীকরণে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমানে এই জোট নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা এখনও রাজনৈতিক জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।
### ডিলিমিটেশন নিয়ে জাতীয় বিতর্ক
ডিলিমিটেশন ইস্যু এখন শুধু সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্র-রাজ্য ভারসাম্যের বিষয়। জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস হলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের পার্থক্য তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই বেশ কিছু দল কেন্দ্রের প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে।
অন্যদিকে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতের সংসদে দেশের জনসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। এই বিতর্কের মধ্যেই অকালি দলের ৫০ শতাংশ করে আসন বাড়ানোর প্রস্তাবে সমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে সামনে এসেছে।
### কেন্দ্রের তরফে স্বাগত
অকালি দলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তিনি জানিয়েছেন, ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিলিমিটেশন এবং মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। SAD-এর এই অবস্থানকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সব মিলিয়ে, সুখবীর সিং বাদলের নেতৃত্বাধীন অকালি দলের ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ বিলের পক্ষে অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে এটি ডিলিমিটেশন নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থানকে কিছুটা রাজনৈতিক সমর্থন জোগাচ্ছে, অন্যদিকে পঞ্জাবে সম্ভাব্য BJP-SAD সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই সমর্থন কীভাবে সংসদীয় রাজনীতি এবং পঞ্জাবের নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।


