প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি মহম্মদ হামিদ আনসারির একটি মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিল্লিতে প্রয়াত আইনজ্ঞ, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও লেখক এজি নুরানির স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আনসারি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর একটি পুরনো মন্তব্যের উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নেহরু একসময় বলেছিলেন, ভারতের জন্য প্রকৃত বিপদ কমিউনিজম নয়, বরং হিন্দু দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িকতা। আনসারির এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিজেপির পক্ষ থেকে তার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত হয় তৃতীয় এজি নুরানি মেমোরিয়াল লেকচার। অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল **“Remembering a Polymath: The Life and Times of Abdul Ghafoor Noorani”**। সেই মঞ্চেই আনসারি নুরানির লেখা এবং তাঁর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চিন্তাধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, নাগরিকত্ব এবং ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নুরানির বক্তব্য।
### নুরানির বইয়ের প্রসঙ্গ টানলেন আনসারি
আনসারি তাঁর বক্তব্যে এজি নুরানির ২০১৯ সালে প্রকাশিত **‘The RSS: A Menace to India’** বইটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, নুরানি বইটির ভূমিকায় জাতীয়তাবাদ ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সেই প্রসঙ্গেই তিনি নুরানির লেখায় উদ্ধৃত নেহরুর একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন।
আনসারি জানান, প্রাক্তন বিদেশসচিব জগৎ সিং গুন্দেভিয়ার নথিভুক্ত করা একটি বৈঠকের বক্তব্যে নেহরু ভারতের জন্য সম্ভাব্য বিপদের প্রসঙ্গে কমিউনিজম এবং হিন্দু দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। আনসারির বক্তব্য অনুযায়ী, নেহরুর সেই মন্তব্যের মূল বক্তব্য ছিল—ভারতের জন্য বিপদ কমিউনিজম নয়, হিন্দু দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িকতা।
তবে এই মন্তব্যটি আনসারির নিজের নতুন কোনও রাজনৈতিক নীতির ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং নুরানির বই এবং সেখানে উদ্ধৃত নেহরুর পুরনো বক্তব্যের প্রসঙ্গ হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন। অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়েই ছিল নুরানির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চিন্তাভাবনার আলোচনা।
### নাগরিক জাতীয়তাবাদ নিয়েও উদ্বেগ
হামিদ আনসারি তাঁর বক্তব্যে ভারতের **civic nationalism** বা নাগরিক জাতীয়তাবাদের ধারণার কথাও বলেন। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা নাগরিক জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং তার পরিবর্তে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের একটি নতুন ধারণা সামনে আনছে।
আনসারির বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রবণতার মাধ্যমে নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে এক করে দেখানোর চেষ্টা হতে পারে। এর ফলে নাগরিকদের ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করার প্রবণতা, অসহিষ্ণুতা এবং অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের প্রবণতার সাম্প্রতিক কিছু প্রকাশ তাঁর কাছে উদ্বেগজনক এবং তা দেশের আইনের শাসন নিয়ে ভারতের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই বিষয়গুলির মোকাবিলা আইনগত এবং রাজনৈতিক—দুই স্তরেই করা প্রয়োজন।
### বিজেপির পাল্টা প্রতিক্রিয়া
আনসারির মন্তব্য সামনে আসার পর বিজেপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। বিজেপি নেতারা তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন এবং অভিযোগ করেন যে এই ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে হিন্দু সমাজকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বিজেপির পক্ষ থেকে এমনও দাবি করা হয়েছে যে আনসারি রাহুল গান্ধীর নির্দেশে এই ধরনের মন্তব্য করছেন।
তবে এই অভিযোগটি বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্য—এটিকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিজেপির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে।
বিজেপির মুখপাত্রদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, আনসারির মন্তব্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। পাশাপাশি তাঁরা আনসারির অতীতের কিছু বক্তব্যের প্রসঙ্গও টেনে আনেন এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
### VHP-রও সমালোচনা
শুধু বিজেপি নয়, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকেও আনসারির মন্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছে। VHP মুখপাত্র সুরেন্দ্র জৈন দাবি করেন, হিন্দু দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িকতাকে বামপন্থী চরমপন্থার তুলনায় বেশি বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরা দেশের ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননাকর। তিনি আনসারির বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন।
VHP-এর প্রতিক্রিয়ায় আনসারির অতীতের কিছু মন্তব্যের কথাও তুলে ধরা হয়। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র একটি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ এবং ভারতের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
### কে এই হামিদ আনসারি?
মহম্মদ হামিদ আনসারি ভারতের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দেশের উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে। উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি বিভিন্ন দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক বিষয়ে তাঁর বক্তব্য বহু সময়েই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘু অধিকার, নাগরিকত্ব এবং জাতীয়তাবাদের মতো বিষয় নিয়ে তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে।
### এজি নুরানির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চিন্তা
এজি নুরানি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং লেখক। ভারতীয় সংবিধান, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, নাগরিক অধিকার, সাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন লেখালেখি করেছেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন বই এবং প্রবন্ধ ভারতীয় রাজনীতি ও সংবিধান নিয়ে বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।
তাঁর স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনসারির বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল নুরানির চিন্তাভাবনা এবং লেখাকে নতুন করে আলোচনায় আনা। সেই প্রসঙ্গেই উঠে আসে নেহরুর পুরনো বক্তব্য এবং ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রশ্ন।
### জাতীয়তাবাদ নিয়ে ফের সামনে পুরনো বিতর্ক
আনসারির মন্তব্যের পর ভারতের জাতীয়তাবাদ নিয়ে পুরনো বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। একদিকে নাগরিক জাতীয়তাবাদকে ধর্ম, ভাষা বা সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখার ধারণা রয়েছে। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে।
আনসারি তাঁর বক্তব্যে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার কেন্দ্রেই রয়েছে রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচয় এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সম্পর্ক। তাঁর মতে, নাগরিকদের ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক করার প্রবণতা তৈরি হলে তা সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনের শাসনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি ও VHP তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং এটিকে হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে মন্তব্য হিসেবে দেখেছে।
ফলে হামিদ আনসারির এই বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক মূলত ভারতের জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের ব্যাখ্যা নিয়ে। আপাতত রাজনৈতিক মহলে এই মন্তব্যের পক্ষে ও বিপক্ষে বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।


