ময়নাগুড়িতে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তের মধ্যেই শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে। শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহারের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থার (NBSTC) একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লরির সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ছয়জন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও বহু যাত্রী, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি এলাকার উল্লাডাবরী সংলগ্ন অঞ্চলে। বাসটি শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহারের দিকে যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হঠাৎ করেই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভারী পণ্যবাহী লরির পিছনে প্রবল গতিতে ধাক্কা মারে। সংঘর্ষের অভিঘাত এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে বাসের সামনের অংশ প্রায় সম্পূর্ণভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং জরুরি পরিষেবার কর্মীরাও সেখানে পৌঁছান। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে ময়নাগুড়ি ও জলপাইগুড়ির বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে ৩০ জনেরও বেশি যাত্রী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃতদের নাম পম্পা সাহা, তাঁর দেড় বছরের শিশু পুত্র বিবেক সাহা, যমুনা রায়, সজল সরকার, শুভঙ্কর শীল এবং শ্যামল চন্দ্র বর্মন। একই পরিবারের মা ও শিশুপুত্রের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া আরও গভীর হয়েছে।
এছাড়াও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত দু’জনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। চিকিৎসকরা তাঁদের শারীরিক অবস্থার উপর কড়া নজর রাখছেন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি শুরু করেন। আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রীসহ একাধিক প্রশাসনিক প্রতিনিধি। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তও শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতি অথবা চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে পুলিশ সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে।
এদিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে রাজ্য সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুতর আহতদের জন্য এক লক্ষ টাকা এবং তুলনামূলকভাবে কম আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মহলে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ সামাজিক মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করেছেন এবং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা ও গণপরিবহণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ময়নাগুড়ির এই ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে সড়কে সামান্য অসাবধানতাও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রয়েছে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ।


