সিকিমের নামচি জেলার তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনায় **মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫**। দীর্ঘ চার দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযানের শেষে সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে বাকি শ্রমিকদের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে উদ্ধার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা হয়েছে এবং ঘটনার কারণ জানতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, সুড়ঙ্গের ভিতরে **মিথেন গ্যাস জমে বিস্ফোরণ** ঘটার পর ধস নামে। বিস্ফোরণের সময় বহু শ্রমিক সুড়ঙ্গের ভেতরে কাজ করছিলেন। বিষাক্ত গ্যাস এবং ধসের কারণে অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারেননি। মাত্র কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ নিয়ে বাইরে বেরোতে সক্ষম হন, বাকিরা ভিতরেই আটকে পড়েন।
দুর্ঘটনার পরপরই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), সেনাবাহিনী, রাজ্য প্রশাসন এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। কিন্তু সুড়ঙ্গের ভিতরে **মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি** উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। উদ্ধারকর্মীরা বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে অল্প সময়ের জন্য সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে বাধ্য হন।
চার দিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের পর সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে শেষ দেহগুলিও উদ্ধার করা হয়। এর ফলে মৃতের সংখ্যা ২৫-এ পৌঁছায়। প্রশাসন জানিয়েছে, নিখোঁজদের খোঁজে আর কোনও সম্ভাবনা না থাকায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ এবং তাঁদের পরিবারের হাতে মরদেহ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এই দুর্ঘটনার পর কেন্দ্র ও সিকিম সরকার উভয়েই গভীর শোক প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ক্ষতিপূরণের ঘোষণাও করেছেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই এলাকায় সুড়ঙ্গ নির্মাণের সময় গ্যাস জমে যাওয়া, ভূমিধস এবং ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাই বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলিও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা মান বজায় রাখা এবং নিয়মিত গ্যাস পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর হলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার দাবিও উঠেছে।
প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষাক্ত গ্যাসে ভরা সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্ধারকারী দলগুলিকে বিশেষ প্রশিক্ষণ, উন্নত শ্বাসযন্ত্র এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সাহায্যে কাজ করতে হয়েছে। ফলে উদ্ধার অভিযান প্রত্যাশার তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে।
সব মিলিয়ে, **সিকিমের তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনায় ২৫ জনের মৃত্যু** দেশের অন্যতম বড় শিল্প দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন তদন্তের রিপোর্ট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আনা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।


