আইন পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার আগে কোনও আইন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI) বা কোনও রাজ্য বার কাউন্সিলের নেই। এই ধরনের পড়ুয়াদের আচরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সেই প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের।
এই রায়কে ঘিরে মূল বিতর্কের সূত্রপাত হায়দরাবাদের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ ইউনিভার্সিটি, অর্থাৎ NALSAR-এর একটি ঘটনা থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পড়ুয়া সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতা করেছিলেন। সেই ছাত্র আন্দোলনের পরেই বার কাউন্সিলের তরফে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হলেও বিষয়টি আদালতে পৌঁছয়।
### কী বলল সুপ্রিম কোর্ট?
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ বৃহস্পতিবার স্পষ্ট করে দিয়েছে, Advocates Act, 1961-এর অধীনে BCI বা রাজ্য বার কাউন্সিলকে আইন পড়ুয়াদের আচরণের বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করে।
আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, বার কাউন্সিলের পেশাগত শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা মূলত আইনজীবীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনও আইন পড়ুয়া এখনও আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত না হলে তাঁর উপর সেই পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তিমূলক কর্তৃত্ব কার্যকর হয় না। অর্থাৎ আইন পড়া এবং আইনজীবী হিসেবে পেশায় প্রবেশ—এই দুই পর্যায়ের মধ্যে আইনি ক্ষমতার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
### পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে?
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই বিষয়টিও পরিষ্কার হয়েছে। আইন পড়ুয়াদের আচরণ নিয়ে কোনও অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, আইন কলেজ অথবা সেই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।
অর্থাৎ কোনও ছাত্র বা ছাত্রীর আচরণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভঙ্গ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই জায়গায় সরাসরি বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই।
এই পর্যবেক্ষণের ফলে আইনশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক কর্তৃত্ব আরও স্পষ্ট হল। একই সঙ্গে পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে সীমারেখাও নির্দিষ্ট করে দিল আদালত।
### NALSAR বিতর্ক থেকেই মামলার সূত্রপাত
NALSAR-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পড়ুয়াদের একটি অংশ সেই আমন্ত্রণের বিরোধিতা করে। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের আপত্তি জানান এবং বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদও করেন।
পড়ুয়াদের এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ হয়ে BCI-এর তরফে এমন নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, যাতে NALSAR-এর ২০২৬ সালের স্নাতকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনও রাজ্য বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত না করার কথা বলা হয়েছিল। পরে প্রবল বিতর্কের মধ্যে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেয় BCI।
ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন ওঠে—আইনজীবী হিসেবে এখনও নথিভুক্ত না হওয়া পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ পেশাগত পরিচয় নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কি আদৌ বার কাউন্সিলের রয়েছে? সেই প্রশ্নেরই আইনি নিষ্পত্তি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে।
### বার কাউন্সিলের ক্ষমতা কোথা থেকে শুরু?
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের মূল জায়গাটি হল ‘enrolment’ বা আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্তি। কোনও ব্যক্তি আইন নিয়ে পড়াশোনা করছেন—এই পরিচয় এবং তিনি আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন—এই পরিচয় এক নয়।
আইন পড়ুয়া যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছেন, তখন তাঁর শিক্ষাগত এবং শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলি মূলত সেই প্রতিষ্ঠানের নিয়মের অধীন। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে তিনি যখন আইনজীবী হিসেবে বার কাউন্সিলে নথিভুক্ত হন, তখন পেশাগত আচরণ এবং পেশাগত শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা কার্যকর হয়।
তাই আদালতের রায়কে বার কাউন্সিলের সমস্ত ক্ষমতা খর্ব করা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং কোন পর্যায়ে বার কাউন্সিলের ক্ষমতা কার্যকর হয় এবং কোন পর্যায়ে তা প্রযোজ্য নয়, সেটিই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
### মতপ্রকাশ ও ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ
এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ছাত্রদের মতপ্রকাশ এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্ন। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা কোনও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে বা প্রশাসনিক কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবাদ করলে, সেই আচরণের মূল্যায়ন করার প্রথম দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।
NALSAR-এর ঘটনাতেও পড়ুয়াদের প্রতিবাদ ছিল একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। তাঁদের আন্দোলনের পদ্ধতি বা আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ভঙ্গ করেছে কি না, তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নির্ধারণ করতে পারে। সেই জায়গায় পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রশ্নেই আদালত সীমারেখা টেনে দিয়েছে।
### ভবিষ্যতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় দেশের সমস্ত আইন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে কোনও আইন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে আচরণগত অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ করতে হবে। একইসঙ্গে কোনও পড়ুয়াকে আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত করার সময় তাঁর যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক শর্ত পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের ভূমিকা অবশ্যই থাকবে।
অর্থাৎ রায়ের ফলে বার কাউন্সিল এবং আইনশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পরস্পরের থেকে আরও পরিষ্কারভাবে আলাদা হয়ে গেল। ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব একদিকে, আর আইনজীবী হিসেবে পেশাগত আচরণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব অন্যদিকে।
সব মিলিয়ে, NALSAR-এর ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আইনশিক্ষা এবং পেশাগত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট—**আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার আগে আইন পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে পেশাগত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার বার কাউন্সিলের নেই।** ছাত্রদের আচরণ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের।


