দুর্গাপুজো মানেই কলকাতার আলো, মণ্ডপ, প্রতিমা, ঢাকের বাদ্যি এবং সাংস্কৃতিক উৎসব। এবার সেই চেনা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে প্রযুক্তির নতুন চমক। পুজোর রাতে কলকাতার আকাশে দেখা যাবে বিশাল ড্রোন শো। প্রায় ৩ হাজার ড্রোন একসঙ্গে আকাশে উড়ে আলোর মাধ্যমে তুলে ধরবে দুর্গাপুজো এবং বাংলার সংস্কৃতির নানা ছবি। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে কলকাতার গঙ্গাবক্ষে যে ধরনের বড় মাপের ড্রোন প্রদর্শনী হয়েছিল, তারই আদলে এবার পুজোকেন্দ্রিক বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার।
নবান্ন সূত্রে খবর, এবারের দুর্গাপুজোকে শুধু রাজ্যের মানুষের উৎসব হিসেবে নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করতে চাইছে সরকার। সেই লক্ষ্যেই পুজোর সময় একাধিক বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মহালয়া এবং পুজোর আরও দু’টি দিনে থাকবে আলাদা সাংস্কৃতিক আয়োজন। কলকাতার আকাশে ড্রোনের আলো, মাটিতে মঞ্চের অনুষ্ঠান এবং সঙ্গীত—সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে এক অভিনব উৎসবের আবহ।
### ৩ হাজার ড্রোনে ফুটে উঠবে দুর্গাপুজোর ছবি
প্রস্তাবিত ড্রোন শোয়ের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে প্রায় ৩ হাজার ড্রোনের সমন্বিত আলোক প্রদর্শনী। আকাশে নির্দিষ্ট বিন্যাসে উড়তে থাকা ড্রোনগুলির আলো ব্যবহার করে বিভিন্ন দৃশ্য ও প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন চিত্র, বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির নানা দিককে এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হতে পারে।
সাধারণ আতশবাজির বদলে প্রযুক্তিনির্ভর এই ধরনের আকাশ প্রদর্শনী এখন বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বড় উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কলকাতাতেও আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রায় ৩ হাজার ড্রোনের প্রদর্শনী দর্শকদের নজর কেড়েছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
### ড্রোন, আলো, সঙ্গীত—একসঙ্গে তৈরি হবে শো
শুধু আকাশে ড্রোন উড়িয়েই অনুষ্ঠান শেষ হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ড্রোনের গতিবিধি, আলোর বিন্যাস, সঙ্গীত এবং মঞ্চের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে পুরো প্রদর্শনী সাজানো হবে। ফলে দর্শকদের সামনে তৈরি হতে পারে একটি সমন্বিত অডিয়ো-ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা।
মহালয়ার পাশাপাশি পুজোর আরও দু’টি নির্ধারিত দিনে বিশেষ অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার মধ্যে অষ্টমীকে কেন্দ্র করে একটি বড় আয়োজন হতে পারে। সেখানে ধুনুচি নাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিশেষ আলোকসজ্জার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ পুজোর প্রচলিত আবহের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি এবং মঞ্চ পরিবেশনাকে একই অনুষ্ঠানে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
### শুধু কলকাতা নয়, তুলে ধরা হবে গোটা বাংলার সংস্কৃতি
এই আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সামনে আনা। শুধু দুর্গাপুজো বা কলকাতার পুজোর দৃশ্য নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের লোকসংস্কৃতিও অনুষ্ঠানের অংশ হতে পারে।
পরিকল্পনায় রয়েছে ছৌ, ঝুমুর, বাউল, কীর্তন, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং লোকসঙ্গীতের পরিবেশনা। একই সঙ্গে নেপালি সংস্কৃতি এবং সমকালীন শিল্পকলাকেও জায়গা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে বাংলার বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একটি বড় প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
পুজোর মণ্ডপও এই প্রচারের অংশ হতে চলেছে। বাংলার বিভিন্ন থিম প্যান্ডেল, পুজোর আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প এবং তাঁতশিল্পের মতো বিষয়গুলিকেও তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাংলার পর্যটন ও সংস্কৃতির একটি বিস্তৃত ছবি তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
### বিদেশে থাকা বাঙালিরাও যুক্ত হবেন উৎসবে
দুর্গাপুজো এখন আর শুধুমাত্র কলকাতা বা বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালিরাও প্রতিবছর পুজোর আয়োজন করেন। এবার সেই আন্তর্জাতিক বাঙালি সম্প্রদায়কেও রাজ্যের উৎসবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, বিদেশের বিভিন্ন বাঙালি সংগঠনের পাশাপাশি ভারতীয় দূতাবাসগুলিকেও এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে কলকাতার দুর্গাপুজোর ছবি এবং বাংলার সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও আরও বড় পরিসরে পৌঁছতে পারে।
### সরকারি ভবনেও আলোর সাজ
পুজো উপলক্ষে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও স্থাপত্যগুলিকেও আলোকসজ্জায় সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারি কাঠামোর ক্ষেত্রে আলোকসজ্জা মূলত স্থাপত্যের সৌন্দর্য তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি ভবনগুলিকে কোনও রাজনৈতিক বা অন্য কোনও প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে স্থাপত্যভিত্তিক আলোকসজ্জার মাধ্যমে উৎসবের আবহ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য রাতে আলোকিত হলে তা কলকাতার উৎসবের চেহারাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
### চার ঘণ্টার গ্র্যান্ড দুর্গাপুজো কনসার্ট
ড্রোন শোয়ের পাশাপাশি পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে একটি বড় মাপের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। কোনও বড় স্টেডিয়াম, অডিটোরিয়াম অথবা উপযুক্ত কোনও স্থানে প্রায় চার ঘণ্টার ‘গ্র্যান্ড দুর্গাপুজো কনসার্ট’ করার কথা ভাবা হয়েছে।
এই অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় শিল্পী, সেলিব্রিটি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহণ থাকতে পারে। সেখানে একদিকে থাকবে ঢাক ও ধুনুচি নাচ, অন্যদিকে বিভিন্ন লোকশিল্প এবং আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে সমকালীন পরিবেশনার সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্য রয়েছে এই অনুষ্ঠানে।
### পুজোকে ঘিরে পর্যটনেও জোর
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কলকাতায় প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক আসেন। ফলে উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এই ধরনের বড় আয়োজন পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ড্রোন শো, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বাংলার শিল্প-হস্তশিল্পের প্রদর্শন—সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে আনা হলে কলকাতার পুজোকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আকর্ষণ হিসেবে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষ করে বিদেশে থাকা বাঙালি সংগঠন এবং ভারতীয় দূতাবাসগুলিকে যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকায় কলকাতার পুজোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় কলকাতার আকাশে ৩ হাজার ড্রোনের আলোয় বাংলার সংস্কৃতির ছবি ফুটিয়ে তোলার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে অভিনব। ঐতিহ্যবাহী ঢাক-ধুনুচির সঙ্গে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, আলো ও সঙ্গীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে পুজোর উদযাপনকে নতুন মাত্রা দিতে চাইছে রাজ্য। মহালয়া থেকে পুজোর বিশেষ দিনগুলি পর্যন্ত একাধিক অনুষ্ঠান এবং চার ঘণ্টার গ্র্যান্ড কনসার্টের পরিকল্পনা থাকায় এবারের উৎসবের পরিসরও বড় হতে চলেছে। এখন অপেক্ষা, পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিলে কলকাতার আকাশে সেই ৩ হাজার আলোকিত ড্রোন কীভাবে বাংলার দুর্গাপুজো ও সংস্কৃতির গল্প বলে।


