প্রিন্সেস ডায়ানার বিখ্যাত ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ আবারও শিরোনামে। রাজপরিবারের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত পোশাকটি এবার নিলামে উঠতে চলেছে। ১৯৯৪ সালে প্রিন্স চার্লসের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে আসার রাতেই যে কালো পোশাক পরে জনসমক্ষে হাজির হয়েছিলেন ডায়ানা, সেটিই পরবর্তীকালে ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামে পরিচিতি পায়। প্রায় তিন দশক পর পোশাকটি আবার নিলামে উঠছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কে সোথেবি’স-এর নিলামে এই ঐতিহাসিক পোশাক বিক্রি হওয়ার কথা।
### কেন এত বিখ্যাত ডায়ানার এই পোশাক?
১৯৯৪ সালের ২৯ জুন লন্ডনের সার্পেন্টাইন গ্যালারিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। অনুষ্ঠানটি ছিল ভ্যানিটি ফেয়ার আয়োজিত একটি ফান্ডরেইজিং ডিনার। সেই রাতেই একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস তাঁর বিবাহিত জীবনে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন।
চার্লসের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ডায়ানা হয়তো জনসমক্ষে আসবেন না। কিন্তু সকলকে চমকে দিয়ে তিনি ওই অনুষ্ঠানে হাজির হন। তাঁর পরনে ছিল শরীরের সঙ্গে মানানসই কালো সিল্কের অফ-দ্য-শোল্ডার পোশাক। পোশাকটির নকশা করেছিলেন গ্রিক বংশোদ্ভূত ডিজাইনার ক্রিস্টিনা স্টামবোলিয়ান।
ডায়ানার সেই উপস্থিতি রাতারাতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়ে নেয়। পোশাকটি ছিল সাহসী, আধুনিক এবং রাজপরিবারের প্রচলিত পোশাকবিধির তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ফলে পোশাকটি শুধু ফ্যাশনের অংশ হয়ে থাকেনি, বরং ডায়ানার আত্মবিশ্বাস ও নিজের বক্তব্য নিজেই প্রকাশ করার প্রতীক হয়ে ওঠে।
### ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামটি কীভাবে এল?
ডায়ানার ওই পোশাকের সরকারি নাম ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ ছিল না। সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরাই পরবর্তীকালে পোশাকটির এই নাম দেন। কারণ, চার্লসের স্বীকারোক্তির রাতেই ডায়ানার এমন আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতিকে অনেকেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংকটের বিরুদ্ধে প্রতীকী জবাব হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে পোশাকটিকে শুধুমাত্র প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে দেখা হয়। ফ্যাশন ইতিহাসবিদদের মতে, ডায়ানা ওই পোশাকের মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণ, আত্মসম্মান এবং স্বাধীন ব্যক্তিত্বকে সামনে এনেছিলেন। তিনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে আড়ালে না থেকে নিজের মতো করে জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন।
এই কারণেই ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ শব্দবন্ধটি পরবর্তীকালে ফ্যাশন দুনিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী পোশাক পরে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রবণতাকে ‘রিভেঞ্জ ড্রেসিং’ বলা শুরু হয়।
### পোশাকটির নকশায় কী ছিল বিশেষত্ব?
ডায়ানার বিখ্যাত কালো পোশাকটি তৈরি হয়েছিল সিল্ক দিয়ে। পোশাকটির গলার অংশ ছিল খোলা এবং কাঁধের বেশিরভাগ অংশ অনাবৃত ছিল। শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা নকশা, ছোট দৈর্ঘ্য এবং সাহসী কাটিং পোশাকটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
পোশাকটি তৈরি করার সময় ডায়ানা প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন বলে ফ্যাশন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মনে হয়েছিল, পোশাকটি হয়তো রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর জন্য অতিরিক্ত সাহসী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেটিই বেছে নেন।
এই সিদ্ধান্তই পোশাকটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। কারণ ডায়ানা শুধু একটি পোশাক পরেননি, বরং নিজের জনসমক্ষে উপস্থিতির ধরনও বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর পোশাকের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিত্বের যে বার্তা গিয়েছিল, তা আজও ফ্যাশন দুনিয়ায় আলোচিত।
### কত টাকায় বিক্রি হতে পারে?
সোথেবি’স-এর অনুমান অনুযায়ী, নিলামে ডায়ানার এই পোশাকের দাম ১ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ মার্কিন ডলারের মধ্যে উঠতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় এই মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা থেকে ২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তবে নিলামে প্রকৃত দর কত উঠবে, তা নির্ভর করবে ক্রেতাদের আগ্রহ এবং পোশাকটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের উপর।
এটি শুধু একটি বিখ্যাত পোশাক নয়, বরং রাজপরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। ফলে ফ্যাশন সংগ্রাহক, রাজপরিবারের স্মারক সংগ্রাহক এবং আন্তর্জাতিক নিলামপ্রেমীদের মধ্যে পোশাকটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
### এর আগে কবে নিলামে উঠেছিল?
ডায়ানা জীবিত থাকাকালীন ১৯৯৭ সালে তাঁর বেশ কিছু পোশাক দাতব্য নিলামে বিক্রি করা হয়েছিল। সেই নিলামের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ক্যানসার এবং এইডস-সংক্রান্ত দাতব্য কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ও সেই সময় নিলামে বিক্রি হয়েছিল। প্রায় তিন দশক পর পোশাকটি আবার বাজারে ফিরছে। এত বছর ধরে এটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত ছিল। এবার নতুন করে নিলামে ওঠার ফলে পোশাকটির ইতিহাস, মালিকানা এবং ডায়ানার ফ্যাশন-ঐতিহ্য নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে।
### নিলামের আগে প্রদর্শিত হবে পোশাকটি
নিলামের আগে ডায়ানার পোশাকটি বিভিন্ন শহরে প্রদর্শন করা হবে। লন্ডন, হংকং, জেনেভা এবং নিউ ইয়র্কে পোশাকটি দর্শকদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সাধারণ দর্শক এবং ফ্যাশনপ্রেমীরাও নিলামের আগে পোশাকটি দেখার সুযোগ পেতে পারেন।
এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে পোশাকটির নকশা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ডায়ানার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এর সম্পর্ক তুলে ধরা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও পোশাকের মূল্য শুধু তার উপাদান বা ডিজাইনের উপর নির্ভর করে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পও তাকে অমূল্য করে তোলে। ডায়ানার এই পোশাক তার অন্যতম বড় উদাহরণ।
### ডায়ানার ফ্যাশন-ঐতিহ্য আজও অমলিন
প্রিন্সেস ডায়ানা শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকনও। তাঁর পোশাকের ধরন, চুলের স্টাইল, গয়না এবং জনসমক্ষে উপস্থিতির ভঙ্গি এখনও বহু মানুষের অনুপ্রেরণা।
ডায়ানার পোশাকের মধ্যে ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও তাঁর ফ্যাশন-ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত। রাজকীয় পোশাকের প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে আরও স্বাভাবিক, আধুনিক এবং আত্মবিশ্বাসী এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন।
তাঁর পোশাক পরবর্তী প্রজন্মের ডিজাইনারদেরও প্রভাবিত করেছে। সিনেমা, টেলিভিশন এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’-এর উল্লেখ দেখা যায়। ফলে পোশাকটি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি নয়, বরং ফ্যাশন ইতিহাসের স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে।
### পোশাকের আড়ালে আত্মবিশ্বাসের গল্প
ডায়ানার ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় শুধু চার্লসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রসঙ্গ সামনে আসে। কিন্তু পোশাকটির প্রকৃত গুরুত্ব আরও গভীরে। এটি এমন এক সময়ের প্রতীক, যখন ডায়ানা ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও নিজের পরিচয় এবং আত্মবিশ্বাসকে জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাঁর সেই উপস্থিতি দেখিয়েছিল, ফ্যাশন শুধু সাজসজ্জা নয়—অনেক সময় তা হয়ে উঠতে পারে মতপ্রকাশের মাধ্যম। একটি পোশাকের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের মানসিক অবস্থান, আত্মসম্মান এবং স্বাধীনতার বার্তা দিতে পারেন। ডায়ানার ক্ষেত্রে সেই বার্তাই সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রিন্সেস ডায়ানার ঐতিহাসিক ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ ফের নিলামে ওঠা নিছক একটি ফ্যাশন সংক্রান্ত ঘটনা নয়। এটি রাজপরিবারের ইতিহাস, ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাস এবং ফ্যাশনের সাংস্কৃতিক প্রভাব—তিনটিকেই একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর সোথেবি’স-এর নিলামে পোশাকটির দাম কত ওঠে, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও রাজপরিবারপ্রেমীদের।


