নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া শরীরে ঢুকছে। আর সেই ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ বা **Second-hand Smoke (SHS)**-এর জেরে ভারতে মৃত্যুর সংখ্যা গত তিন দশকে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক **The Lancet Public Health**-এ প্রকাশিত Global Burden of Disease (GBD) 2023 বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে প্যাসিভ স্মোকিং-জনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালেই দেশে আনুমানিক **৩ লক্ষ ২৫ হাজার ৬০০ জনের মৃত্যু** দ্বিতীয় হাতের তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, এই সময়ে জনসংখ্যার অনুপাতে প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সংস্পর্শে আসার হার কমলেও মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে ঝুঁকি কমলেও বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাস্তবে ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
## ৩০ বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ২.১৭ লক্ষ থেকে ৩.২৫ লক্ষ
গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে ভারতে প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ছিল **২ লক্ষ ১৭ হাজার ৭০০**। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় **৩ লক্ষ ২৫ হাজার ৬০০**। অর্থাৎ তিন দশকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। জনসংখ্যা ও বয়সের কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করা মৃত্যুহার প্রতি এক লক্ষ জনে ১৯৯০ সালের ৪৬.১ থেকে ২০২৩ সালে ৩০-এ নেমেছে। অর্থাৎ age-standardised death rate প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু মোট জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যুর **absolute number** বা মোট সংখ্যা উল্টো বেড়েছে।
## প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সংস্পর্শে ৪৪.৪ কোটি ভারতীয়
গবেষণার আরও একটি চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল, ২০২৩ সালে ভারতে আনুমানিক **৪৪৪ মিলিয়ন বা ৪৪.৪ কোটি মানুষ** second-hand smoke-এর সংস্পর্শে এসেছেন। ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন বা ৩৭.৫ কোটি। অর্থাৎ তিন দশকে প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় **১৮.৪ শতাংশ বেড়েছে**।
অন্যদিকে বয়স-সমন্বিত exposure prevalence ১৯৯০ সালের ৪৩.২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৩০.৬ শতাংশে নেমেছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, শতাংশের হিসাবে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জনসংখ্যার আকার বৃদ্ধির কারণে মোট ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা এখনও বিপুল।
## বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্যাসিভ স্মোকিং এক্সপোজার ভারতে
শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই second-hand smoke একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০২৩ সালে বিশ্বের আনুমানিক **২.৭১ বিলিয়ন মানুষ** প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সংস্পর্শে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় **৭৬৭ মিলিয়ন শিশু**, যাদের বয়স ০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।
দেশভিত্তিক হিসাবে চিনের পরেই রয়েছে ভারত। ২০২৩ সালে চিনে প্রায় ৬৬৪ মিলিয়ন মানুষ প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সংস্পর্শে ছিলেন। ভারতে সেই সংখ্যা ৪৪৪ মিলিয়ন এবং ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৪২ মিলিয়ন। এই তিন দেশ মিলিয়েই বিশ্বের মোট exposed population-এর প্রায় অর্ধেক।
## সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
প্যাসিভ স্মোকিংয়ের ক্ষতি সকলের ক্ষেত্রেই গুরুতর হতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বিপদের মাত্রা আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বব্যাপী second-hand smoke-এর কারণে তৈরি স্বাস্থ্যঝুঁকির ১২ শতাংশেরও বেশি শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। শিশুদের মধ্যে **lower respiratory infections** বা নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ এই স্বাস্থ্যভার বহনের অন্যতম প্রধান কারণ।
বাড়িতে বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্য ধূমপান করলে শিশুরা নিয়মিত সেই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসতে পারে। ফলে শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
## হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসেও বড় প্রভাব
প্যাসিভ স্মোকিংকে শুধু ফুসফুসের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, second-hand smoke-এর সংস্পর্শে হৃদযন্ত্র এবং শ্বাসযন্ত্র—দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় cardiovascular এবং respiratory conditions-এর সঙ্গে second-hand smoke exposure-এর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই coronary artery disease-এর মতো হৃদরোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শ এড়ানো আরও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বাড়ি, গাড়ি, কর্মক্ষেত্র বা অন্য কোনও বদ্ধ জায়গায় নিয়মিত ধূমপানের অভ্যাস শুধু ধূমপায়ীর শরীরকেই নয়, আশপাশের মানুষকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
## কেন কমল exposure rate, তবুও বাড়ল মৃত্যু?
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল—যদি exposure prevalence কমে থাকে, তাহলে মৃত্যুর মোট সংখ্যা কেন বাড়ল?
এর অন্যতম কারণ জনসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি। ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ভারতের জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে। ফলে মোট জনসংখ্যার তুলনায় exposure-এর হার কমলেও বাস্তবে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে রয়েছেন। সেই বিশাল population base-ই মোট মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম ব্যাখ্যা।
অর্থাৎ শুধু exposure-এর শতাংশ দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। মোট কত মানুষ ধোঁয়ার সংস্পর্শে রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন—দুটিই বিবেচনা করতে হবে।
## শুধু ধূমপায়ীদের সচেতন করলেই হবে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র active smokers-কে ধূমপান ছাড়তে বলা যথেষ্ট নয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্য যাতে তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে না আসেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে বাড়ির ভিতরে ধূমপান না করা, শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের কাছাকাছি ধূমপান সম্পূর্ণ এড়ানো এবং গাড়ি বা ছোট বদ্ধ জায়গায় ধূমপান বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জানালা খুলে বা ঘরের এক কোণে ধূমপান করলেই second-hand smoke-এর ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
## জনস্বাস্থ্যে বড় সতর্কবার্তা Lancet-এর
Lancet-এর এই বিশ্লেষণ কার্যত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—ধূমপানের ক্ষতি শুধু যিনি সিগারেট খান তাঁর শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর আশপাশের মানুষও একই বিষাক্ত পরিবেশের শিকার হতে পারেন।
ভারতে প্যাসিভ স্মোকিংয়ের সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা ৪৪.৪ কোটি হওয়া এবং ২০২৩ সালে এর সঙ্গে যুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৩.২৫ লক্ষের বেশি হওয়া বিষয়টিকে নিছক ব্যক্তিগত অভ্যাসের সমস্যা না রেখে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
তাই তামাক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি **smoke-free homes, smoke-free public spaces এবং শিশুদের ধোঁয়া থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সচেতনতা** বাড়ানো জরুরি। কারণ প্যাসিভ স্মোকিং এমন একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি, যার শিকার অনেক সময় সেই মানুষটিই হন যিনি নিজে কখনও সিগারেট ছোঁননি।


