কমলালেবু বিক্রি করে জমানো টাকা দিয়ে গ্রামের শিশুদের জন্য স্কুল তৈরি করেছিলেন। শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদানের জন্য ২০২০ সালে পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী সম্মান। সেই হরেকলা হাজাব্বাকেই এবার ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা **Special Intensive Revision (SIR)**-এর নোটিস ঘিরে তৈরি হল চর্চা। কর্নাটকের ম্যাঙ্গালুরুতে তাঁর বাড়িতে নোটিস পৌঁছনোর পর বিষয়টি সামনে আসে। যদিও পরে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা জানান, নামের অসঙ্গতির কারণে ভুলবশত নোটিসটি দেওয়া হয়েছিল এবং সেটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
### ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় শুধু ‘হাজাব্বা’
ঘটনার সূত্রপাত মূলত নামের অমিল থেকে। নির্বাচন কমিশনের ২০০২ সালের পুরনো ভোটার তালিকায় তাঁর নাম শুধুমাত্র **‘হাজাব্বা’** হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর আধার কার্ড, রেশন কার্ড, পাসপোর্ট এবং বর্তমান ভোটার পরিচয়পত্র-সহ অন্যান্য সরকারি নথিতে নাম রয়েছে **‘হরেকলা হাজাব্বা’**। এই দুই নথির মধ্যে পার্থক্যই SIR যাচাইয়ের সময় আধিকারিকদের নজরে আসে।
নাম নিয়ে এই অসঙ্গতির কারণেই তাঁকে নোটিস দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁকে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে স্থানীয় প্রশাসনের সামনে হাজির হয়ে পরিচয় যাচাই করানোর কথা বলা হয়েছিল।
### পরে বাড়িতেই আধিকারিকদের গিয়ে যাচাই
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দ্রুত পদক্ষেপ করে স্থানীয় প্রশাসন। আধিকারিকরা হাজাব্বার বাড়িতে গিয়ে তাঁর বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করেন এবং তথ্য যাচাই করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধিকারিকরা বুঝতে পারেন যে নোটিস জারির পিছনে মূল সমস্যা ছিল পুরনো ভোটার তালিকায় নামের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং বর্তমান নথিতে পূর্ণ নামের ব্যবধান। এরপর নোটিস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলে হাজাব্বাকে আর নির্দিষ্ট দিনে অফিসে গিয়ে সেই নোটিসের ভিত্তিতে হাজিরা দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। একই সঙ্গে তাঁর ভোটার সংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতিও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
### কে এই হরেকলা হাজাব্বা?
হরেকলা হাজাব্বার জীবনকাহিনি দীর্ঘদিন ধরেই অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। কর্নাটকের দক্ষিণ কন্নড় জেলার বাসিন্দা হাজাব্বা পেশায় ছিলেন কমলালেবু বিক্রেতা। নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজের গ্রামের শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার সংকল্প করেছিলেন তিনি।
কমলালেবু বিক্রি করে সামান্য সামান্য করে টাকা জমিয়ে নিজের গ্রামে একটি স্কুল তৈরির উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সেই উদ্যোগই বড় আকার নেয়। শিক্ষার প্রসারে তাঁর এই অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছ থেকে পদ্মশ্রী গ্রহণের ছবিও তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছে শিক্ষা-আন্দোলনের এক অনন্য মুখ হিসেবে।
### কর্নাটকে চলছে SIR প্রক্রিয়া
আগামী বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কর্নাটকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকায় থাকা নাম, পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অসঙ্গতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের কাছে নোটিস পাঠানো হচ্ছে।
তবে হাজাব্বার ঘটনায় নোটিস জারির পর দ্রুত সেটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ভুলও সামনে এসেছে। আধিকারিকরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে নথি যাচাই করে সমস্যার সমাধান করেছেন।
### SIR ঘিরে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?
হাজাব্বার ঘটনা নিছক একজন পদ্মশ্রী প্রাপকের নামের ভুলের ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় পুরনো রেকর্ড ও বর্তমান পরিচয়পত্রের মধ্যে থাকা ছোটখাটো অসঙ্গতি কীভাবে প্রশাসনিক যাচাইয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে, সেটিও সামনে এসেছে।
বিশেষ করে পুরনো ভোটার তালিকায় কোনও ব্যক্তির নাম সংক্ষিপ্তভাবে লেখা থাকলে এবং পরবর্তী নথিতে পূর্ণ নাম ব্যবহার করা হলে সেই পার্থক্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। হাজাব্বার ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে আধিকারিকদের বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে।
### শেষ পর্যন্ত স্বস্তি হাজাব্বার
প্রথমে SIR নোটিস ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত দ্রুতই পরিস্থিতির সমাধান হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা তাঁর নথি পরীক্ষা করে সমস্যাটি চিহ্নিত করেছেন এবং নোটিস প্রত্যাহার করেছেন। ফলে পদ্মশ্রী প্রাপক হরেকলা হাজাব্বার ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার নিয়ে কোনও চূড়ান্ত প্রশ্ন তৈরি হয়নি; ঘটনাটি মূলত নথিভুক্ত নামের অসঙ্গতি থেকে তৈরি হয়েছিল।
একদিকে যেমন তাঁর জীবনের শিক্ষা-আন্দোলনের গল্প ফের সামনে এসেছে, অন্যদিকে এই ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়ে নথিপত্রে তথ্যের সামঞ্জস্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও নতুন করে তুলে দিয়েছে।


