আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে সাধারণত আলোচনার বিষয় থাকে অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কিংবা আঞ্চলিক সহযোগিতা। কিন্তু সেই গম্ভীর পরিবেশের মধ্যেই এবার বলিউডি গানে মন জয় করলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অনোয়ার ইব্রাহিম। ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসে হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় গান গেয়ে সকলকে চমকে দিয়েছেন তিনি। তাঁর গানের ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় নেটিজেনদের একাংশও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই সাংস্কৃতিক মুহূর্তে মুগ্ধ হয়েছেন।
দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আবহে একটি হোটেলে পিয়ানোর পাশে দাঁড়িয়ে গান গাইতে দেখা যায় অনোয়ার ইব্রাহিমকে। তিনি গেয়েছেন কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারের জনপ্রিয় গান ‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’। ১৯৬৫ সালের হিন্দি ছবি ‘তিন দেবিয়াঁ’-এর এই গান আজও ভারতীয় সংগীতপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেই গানই নিজের কণ্ঠে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
## কিশোর কুমারের গানে মজলেন অনোয়ার
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অনোয়ার ইব্রাহিম একটি পিয়ানোর সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইছেন। পাশে থাকা শিল্পী পিয়ানো বাজাচ্ছেন। অনোয়ারের গলায় শোনা যায় কিশোর কুমারের কালজয়ী গান ‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’। গানটির সুর করেছিলেন এস ডি বর্মন এবং কথা লিখেছিলেন মাজরুহ সুলতানপুরী।
গানটি মূলত দেব আনন্দ অভিনীত ‘তিন দেবিয়াঁ’ ছবির অংশ। ষাটের দশকের এই গান ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এত বছর পরেও গানটির জনপ্রিয়তা অটুট। সেই গান একজন বিদেশি রাষ্ট্রনেতার কণ্ঠে শোনা যাওয়ায় ঘটনাটি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
অনোয়ার নিজেই তাঁর সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে এই গানের ভিডিও শেয়ার করেছেন। ভিডিওর সঙ্গে মালয় ভাষায় তিনি লিখেছেন, “গুরু, একটু গান গাইতে পারি?”—এমন একটি অর্থবোধক ক্যাপশন। তাঁর এই মজার এবং আন্তরিক ভঙ্গি নেটিজেনদের নজর কেড়েছে।
## কূটনীতির মাঝে সাংস্কৃতিক বন্ধন
ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশের রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেই ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেই অনোয়ার ইব্রাহিমের গান গাওয়ার মুহূর্তটি একেবারে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ অনেক সময় কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সহজ ও উষ্ণ করে তোলে। রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে ব্যক্তিগত আগ্রহ, সংগীত, সিনেমা বা শিল্প নিয়ে কথাবার্তা পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে পারে। অনোয়ারের বলিউডি গান গাওয়ার ঘটনাটিকেও সেই সাংস্কৃতিক বন্ধনের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতীয় সিনেমা ও সংগীতের জনপ্রিয়তা শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশেও হিন্দি ছবি এবং গান বহু বছর ধরে জনপ্রিয়। মালয়েশিয়াতেও ভারতীয় সিনেমা, বিশেষ করে হিন্দি ছবির গান, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিচিত। ফলে অনোয়ার ইব্রাহিমের কণ্ঠে কিশোর কুমারের গান শোনা ভারতীয় দর্শকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে।
## ব্রিকস সম্মেলনে মালয়েশিয়ার অংশগ্রহণ
ভারতের সভাপতিত্বে ২০২৬ সালে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নয়াদিল্লিতে। এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা অংশ নেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অনোয়ার ইব্রাহিমও ভারতের আমন্ত্রণে সম্মেলনে যোগ দেন। তাঁর ভারত সফরে কূটনৈতিক বৈঠক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।
ভারত ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা রয়েছে। মালয়েশিয়ায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বড় অংশ বসবাস করেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনোয়ার ইব্রাহিমের বলিউডি গান গাওয়ার ঘটনাকে শুধুমাত্র বিনোদনের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। অনেকের মতে, এটি ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও প্রতিফলন।
## সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেক ভারতীয় ব্যবহারকারী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করেছেন। কেউ তাঁর গানের নির্বাচনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, আবার কেউ তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত আচরণে মুগ্ধ হয়েছেন।
অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন আলোচনার মধ্যে এমন একটি সহজ-সরল সাংস্কৃতিক মুহূর্ত মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। রাষ্ট্রনেতাদের সাধারণ মানুষের মতো গান গাওয়া বা শিল্পচর্চা করা তাঁদের ব্যক্তিত্বের অন্য একটি দিক তুলে ধরে। অনোয়ার ইব্রাহিমের ক্ষেত্রেও সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
ভিডিওটি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যেই তা বহু মানুষের নজরে আসে। কূটনৈতিক সম্মেলনের খবরের পাশাপাশি এই গান গাওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নেয়।
## আগেও গান গেয়েছেন অনোয়ার
অনোয়ার ইব্রাহিমের গান গাওয়ার ঘটনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে রাজনৈতিক সভা, জনসমাবেশ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে দেখা গিয়েছে। সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথা বহুবার প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে তাঁর গান গাওয়া অনেকের কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে।
তবে এবার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ তিনি ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সিনেমার একটি জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। তাও আবার এমন একটি সময়ে, যখন ভারত ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে।
## ভারতীয় সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা
অনোয়ার ইব্রাহিমের এই পরিবেশনা আরও একবার দেখিয়ে দিল, ভারতীয় সিনেমা ও সংগীতের প্রভাব কতটা বিস্তৃত। বলিউডের গান বহু দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি এবং আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীদের গান এখনও বিভিন্ন দেশের মানুষের মুখে শোনা যায়।
‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’ গানটি সেই জনপ্রিয়তারই একটি উদাহরণ। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পাওয়া গানটি আজও নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত। একজন বিদেশি রাষ্ট্রনেতার কণ্ঠে এই গান শোনা ভারতীয় সংগীতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে।
## কূটনীতিতে নতুন মাত্রা
অনোয়ার ইব্রাহিমের এই গান গাওয়ার ঘটনাকে অনেকেই ‘বলিউড ডিপ্লোমেসি’ বা সাংস্কৃতিক কূটনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। কূটনীতি সবসময় কঠোর বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনও একটি গান, একটি শিল্পকর্ম কিংবা একটি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিও দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরি করতে পারে।
ব্রিকস সম্মেলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে এমন একটি অনানুষ্ঠানিক মুহূর্ত উপস্থিত অতিথিদের মধ্যেও আনন্দের পরিবেশ তৈরি করেছে। একইসঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহও স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ব্রিকস সম্মেলনে অনোয়ার ইব্রাহিমের কিশোর কুমারের গান গাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির গম্ভীর পরিবেশে এক টুকরো সাংস্কৃতিক উষ্ণতা এনে দিয়েছে। তাঁর কণ্ঠে ‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’ গানটি শুধু উপস্থিত অতিথিদেরই নয়, সামাজিক মাধ্যমের অসংখ্য ভারতীয় দর্শকেরও মন জয় করেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক মুহূর্তও দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো হয়ে থাকল।


