বিশ্ব পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। ব্রিটিশ-নেপালি কিংবদন্তি পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা পাকিস্তানের ব্রড পিক (Broad Peak)-এ ভয়াবহ তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে অভিযানে থাকা আরও নয়জন পর্বতারোহীরও মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোকস্তব্ধ আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ মহল।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের দ্বাদশ উচ্চতম শৃঙ্গ ব্রড পিক অভিযানে বেরিয়েছিলেন নির্মল পুরজা ও তাঁর আন্তর্জাতিক দল। ক্যাম্প–২ এবং ক্যাম্প–৩-এর মাঝামাঝি প্রায় ৬,৫০০ মিটার উচ্চতায় আচমকা বিশাল তুষারধস নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে গোটা দলটি তুষারের নিচে চাপা পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী, উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় পর্বতারোহীরা ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র ঠান্ডা এবং দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েকদিনের অনুসন্ধানের পর উদ্ধারকারীরা নির্মল পুরজার মরদেহসহ একাধিক পর্বতারোহীর দেহ উদ্ধার করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রী সংস্থা এবং পাকিস্তানের আলপাইন ক্লাব আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
নির্মল পুরজা ছিলেন আধুনিক পর্বতারোহণ জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম। ২০১৯ সালে তিনি মাত্র ১৮৯ দিনে বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি (৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার) শৃঙ্গ জয় করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে তাঁর জীবন ও অভিযানের ওপর নির্মিত **”14 Peaks: Nothing Is Impossible”** তথ্যচিত্রও আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
পর্বতারোহী হওয়ার আগে নির্মল পুরজা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোরখা রেজিমেন্ট এবং পরে ব্রিটিশ স্পেশাল বোট সার্ভিস (SBS)-এ কর্মরত ছিলেন। কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তাই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সফল পর্বতারোহীতে পরিণত করেছিল। শুধু নিজের রেকর্ডই নয়, বহু অভিযানে বিপদে পড়া পর্বতারোহীদের উদ্ধার করেও তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিলেন।
এই দুর্ঘটনায় শুধু নির্মল পুরজাই নন, তাঁর অভিযানে থাকা আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ ও নবীন পর্বতারোহীও প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন, যা এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে। এখনও কয়েকজনের দেহ উদ্ধারের কাজ চলছিল বলে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি জানিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম কঠিন পর্বত হিসেবে পরিচিত ব্রড পিকে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, তুষারধস এবং বরফধসের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের কাছেও এই শৃঙ্গে অভিযান অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও হিমালয় ও কারাকোরাম অঞ্চলের উচ্চতম শৃঙ্গগুলিতে ঝুঁকি কখনও পুরোপুরি এড়ানো যায় না।
নির্মল পুরজার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শোকবার্তা আসতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক পর্বতারোহী, অভিযাত্রী, ক্রীড়াবিদ এবং বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অনেকেই তাঁকে আধুনিক যুগের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক পর্বতারোহীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মল পুরজার অবদান শুধুমাত্র বিশ্বরেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং সাহস থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। তাঁর অভিযাত্রা নতুন প্রজন্মের পর্বতারোহীদের কাছে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পাকিস্তানের ব্রড পিকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বিশ্ব পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক গভীর শোকের অধ্যায় হয়ে থাকবে। নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজার মৃত্যু শুধু নেপাল বা ব্রিটেনের নয়, গোটা আন্তর্জাতিক অভিযাত্রী সম্প্রদায়ের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।


