ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগ দেওয়া নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। সেই কারণেই বাংলাদেশ ব্রিকস সম্মেলনে কোনও সরকারি প্রতিনিধি পাঠায়নি বলে ঢাকার তরফে জানানো হয়।
তবে বাংলাদেশের এই বক্তব্যের জবাব দিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল। একটি ছিল দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের জন্য এবং অন্যটি ছিল ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। ফলে আমন্ত্রণ নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী সঠিক নয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয়টি ফের সামনে এসেছে।
## তারেক রহমানকে দুটি আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিল ভারত
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সরকারের তরফে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম আমন্ত্রণটি ছিল ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য। দ্বিতীয় আমন্ত্রণটি ছিল নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তাঁর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয়ের পাশাপাশি বিমসটেকের চেয়ারম্যানের ভূমিকাও বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। ফলে তাঁকে কোনও আমন্ত্রণই জানানো হয়নি—বাংলাদেশের এই বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের অবস্থান মিলছে না।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন বলে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ ছিল এবং একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল।
## বাংলাদেশের দাবি কী ছিল?
বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাঁর দাবি ছিল, আমন্ত্রণটি এসেছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। বাংলাদেশের তরফে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী নিজে না গেলে তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনও সরকারি প্রতিনিধিকে পাঠানোর সুযোগও ছিল না।
এই বক্তব্যের ভিত্তিতে ঢাকা ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, যেহেতু প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তাই অন্য কোনও সরকারি প্রতিনিধি পাঠানোর প্রশ্নও ওঠে না।
বাংলাদেশের এই অবস্থান প্রকাশ্যে আসার পরই আমন্ত্রণের প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য সামনে আসার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নয়াদিল্লি জানায়, ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ এবং দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ—দুটি আলাদা বিষয় ছিল।
## ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি
ভারতের সভাপতিত্বে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এই সম্মেলনে ব্রিকস সদস্য দেশগুলির পাশাপাশি একাধিক অংশীদার দেশ ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশ বিমসটেকের চেয়ারম্যান দেশ হিসেবে এই আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করতে পারত। কিন্তু তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি—এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ঢাকা সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের কোনও সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ঢাকা হয়তো বোঝাতে চেয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা না দিলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দেশটি আগ্রহী নয়। অন্যদিকে ভারতের বক্তব্য, আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনও ঘাটতি ছিল না।
## দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরও আটকে গেল
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তারেক রহমানের একটি পৃথক ভারত সফরের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সফরও হয়নি। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। তারেক রহমানের ভারত সফর হলে এই প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসতে পারত বলে মনে করা হচ্ছিল।
এছাড়াও সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নদীর জলবণ্টন, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি সামনে থাকায় দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
## ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন চাপ
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। অতীতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে অসন্তোষ রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সংক্রান্ত ঘটনাগুলির দিকে নজর রাখছে। এর মধ্যে ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঢাকা জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং পারস্পরিক সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ভারতের পক্ষ থেকেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। তবে আমন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্য মতপার্থক্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে।
## বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় প্রভাব পড়বে?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। স্থলবন্দর, রেলপথ, নদীপথ এবং বিদ্যুৎ সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। একইভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা চলছিল। দুই দেশের মধ্যে একাধিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশের কিছু মহল থেকে সেই চুক্তিগুলি পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে। যদিও এই ধরনের বক্তব্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কূটনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাণিজ্য, সীমান্ত যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে দুই দেশই যদি নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য মেটানোর চেষ্টা করে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
## ব্রিকস নিয়ে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান
ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লির সম্মেলনে একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান অংশ নেন। সেখানে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়। তবে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেশটির প্রতিনিধিত্বের সুযোগ ছিল। সেই কারণে তারেক রহমানের আমন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু আমন্ত্রণের ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যের পার্থক্য সম্মেলনের কূটনৈতিক গুরুত্বকে ছাপিয়ে যায়।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের দরজা খোলা ছিল। বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ফলে সেই সুযোগ ব্যবহার করা হয়নি। এখন প্রশ্ন, ভবিষ্যতে ঢাকা ও নয়াদিল্লি এই বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করবে কি না।
## সামনে কী হতে পারে?
আমন্ত্রণ বিতর্কের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের বিদেশ মন্ত্রকের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা হতে পারে। তারেক রহমানের ভারত সফর ভবিষ্যতে নতুন করে নির্ধারিত হবে কি না, তা-ও নজরে থাকবে।
ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ এখনও কার্যকর রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যেতে পারেন। সেই সফরে শেখ হাসিনা, বাণিজ্য, সীমান্ত, নদীর জল এবং নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের ব্রিকস সফর নিয়ে বিতর্ক শুধু একটি আমন্ত্রণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান, দুই দেশের কূটনৈতিক আস্থা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ। ভারতের দাবি, বাংলাদেশকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় তারা সম্মেলনে অংশ নেয়নি। এই দুই অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব কমাতে এখন প্রয়োজন সরাসরি ও স্বচ্ছ কূটনৈতিক আলোচনা।


