সূর্যের মতো বিপুল শক্তি উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চালাচ্ছেন বিশ্বের বিজ্ঞানীরা। সেই আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারত। গুজরাটের গান্ধীনগরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা রিসার্চ বা IPR-এর গবেষণাগারে ‘কৃত্রিম সূর্য’ তৈরির পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ভারতের পরীক্ষামূলক ফিউশন যন্ত্র SST-1 টোকাম্যাকে নতুন শক্তিশালী একটি গাইরোট্রন যন্ত্র স্থাপন ও চালু করা হয়েছে।
এই নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে আরও কার্যকরভাবে গরম করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা। পরমাণু সংযোজন বা নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে পরিষ্কার ও বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে ভারতের SST-1 কোনও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এটি মূলত ফিউশন শক্তি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষার জন্য তৈরি একটি উন্নত যন্ত্র।
## কী এই ‘কৃত্রিম সূর্য’?
‘কৃত্রিম সূর্য’ কথাটি শুনলেও এটি আসলে কোনও আসল সূর্য তৈরি করার প্রকল্প নয়। সূর্যের কেন্দ্রে যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হয়, পৃথিবীর পরীক্ষাগারে সেই একই ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার নাম নিউক্লিয়ার ফিউশন বা পরমাণু সংযোজন।
সূর্যের কেন্দ্রে প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও চাপের কারণে হাইড্রোজেনের মতো হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে। এই সংযোজনের সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। সেই শক্তিই সূর্যের আলো ও তাপের মূল উৎস।
পৃথিবীতে সূর্যের মতো বিপুল মহাকর্ষীয় চাপ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞানীরা বিশেষ চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখার চেষ্টা করেন। এই পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রকে বলা হয় টোকামাক।
## SST-1 টোকামাক কীভাবে কাজ করে?
SST-1-এর পুরো নাম Steady State Superconducting Tokamak। এটি ভারতের একটি পরীক্ষামূলক সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন যন্ত্র। টোকামাক দেখতে অনেকটা ডোনাটের মতো। এর ভিতরে গ্যাসকে অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে প্লাজমায় পরিণত করা হয়।
প্লাজমা হল পদার্থের এমন একটি অবস্থা, যেখানে পরমাণুর ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অবস্থায় পদার্থ অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং বৈদ্যুতিকভাবে সক্রিয় থাকে। ফিউশন ঘটানোর জন্য প্লাজমাকে কয়েক কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি তাপমাত্রায় নিয়ে যেতে হয়।
তবে শুধু প্লাজমাকে উত্তপ্ত করলেই ফিউশন সম্ভব নয়। সেই উত্তপ্ত প্লাজমাকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্লাজমা যদি টোকামাকের দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তাহলে তা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে এবং পরীক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
এই কারণেই শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, উন্নত গরম করার ব্যবস্থা এবং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।
## নতুন গাইরোট্রন যন্ত্রের সাফল্য
ভারতের SST-1 টোকাম্যাকে যে নতুন গাইরোট্রন যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে, সেটির ক্ষমতা ৮২.৬ গিগাহার্টজ এবং ৪০০ কিলোওয়াট। এই যন্ত্র উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ শক্তি তৈরি করে। সেই শক্তি প্লাজমার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে তাকে আরও উত্তপ্ত করা হয়।
এর আগে SST-1-এ ৪২ গিগাহার্টজ ক্ষমতার একটি গাইরোট্রন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হত। নতুন যন্ত্রটি তার তুলনায় বেশি শক্তিশালী এবং উন্নত। ফলে প্লাজমাকে আরও বেশি তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখার ক্ষেত্রে গবেষকরা বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গাইরোট্রনকে সহজভাবে একটি শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ উৎপাদক যন্ত্র বলা যায়। সাধারণ মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির তুলনায় এটি অনেক বেশি শক্তিশালী এবং বিশেষভাবে প্লাজমা উত্তপ্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফিউশন গবেষণায় এই ধরনের যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
## সূর্যের থেকেও বেশি তাপমাত্রা
ফিউশন গবেষণায় সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, পরীক্ষাগারে তৈরি প্লাজমার তাপমাত্রা অনেক সময় সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়। ভারতীয় গবেষণায় প্লাজমার তাপমাত্রা ২০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়েছে বলে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা আনুমানিক দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু পৃথিবীতে সূর্যের মতো মহাকর্ষীয় চাপ না থাকায় ফিউশন ঘটানোর জন্য আরও বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই টোকামাকের ভিতরে প্লাজমাকে সূর্যের কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি উত্তপ্ত করতে হয়।
তবে তাপমাত্রা বাড়ানোই শেষ কথা নয়। প্লাজমা কতক্ষণ স্থিতিশীল থাকে, কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ফিউশন থেকে পাওয়া শক্তি ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছয় কি না—সেগুলিই মূল বিষয়।
## ফিউশন শক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিশন বা পরমাণু বিভাজন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে শক্তি উৎপন্ন হয়। কিন্তু ফিশন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়।
ফিউশন প্রক্রিয়ায় হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হলেও প্রচলিত ফিশন প্রযুক্তির তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের পরিমাণ অনেক কম হতে পারে। এছাড়া ফিউশনের জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ব্যবহার করা যায়, যার উৎস পৃথিবীতে তুলনামূলকভাবে প্রচুর।
এই কারণে ফিউশনকে ভবিষ্যতের পরিষ্কার শক্তির অন্যতম সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখা হয়। সফল হলে ফিউশন শক্তি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
## এখনও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়
ভারতের এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাফল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। SST-1 এখনও একটি গবেষণামূলক যন্ত্র। নতুন গাইরোট্রন স্থাপনের ফলে বিজ্ঞানীরা প্লাজমা উত্তপ্ত ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা চালাতে পারবেন।
ফিউশন থেকে বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একাধিক কঠিন সমস্যা সমাধান করতে হবে। প্রথমত, প্লাজমাকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিউশন প্রক্রিয়ায় যে শক্তি উৎপন্ন হবে, তা যন্ত্র চালাতে ব্যবহৃত শক্তির তুলনায় বেশি হতে হবে। তৃতীয়ত, সেই শক্তিকে নিরাপদ ও সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে হবে।
এই সব ধাপ এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্পকে ভবিষ্যতের শক্তি প্রযুক্তির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলা যায়, কিন্তু এখনই এটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে ঘোষণা করা সম্ভব নয়।
## ভারতের ফিউশন গবেষণায় নতুন দিগন্ত
বিশ্বের একাধিক দেশ ফিউশন শক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। ইউরোপ, আমেরিকা, চিন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলির পাশাপাশি ভারতও এই ক্ষেত্রে নিজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। SST-1 প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত দীর্ঘ সময় ধরে প্লাজমা নিয়ন্ত্রণ, সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক এবং উচ্চক্ষমতার হিটিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
নতুন গাইরোট্রন চালু হওয়া ভারতের গবেষণায় প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতারও ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে আরও উন্নত যন্ত্র, বড় পরীক্ষামূলক রিঅ্যাক্টর এবং আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রকল্পে ভারতের ভূমিকা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারতের ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্প এখনও গবেষণার পর্যায়ে থাকলেও নতুন গাইরোট্রন স্থাপনের ফলে সেই গবেষণা আরও শক্তিশালী হল। সূর্যের শক্তি পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রিতভাবে উৎপাদনের স্বপ্ন পূরণ হতে এখনও সময় লাগবে। কিন্তু SST-1-এর এই অগ্রগতি দেখিয়ে দিল, সেই দীর্ঘ যাত্রায় ভারত ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে।


