ভারতীয় ক্রিকেট দলের তারকা পেসার মহম্মদ সিরাজের কাঁধে এবার বড় দায়িত্ব। আসন্ন রঞ্জি ট্রফি ২০২৬-২৭ মরশুমে হায়দরাবাদ সিনিয়র দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। শুক্রবার হায়দরাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (HCA) সিনিয়র সিলেকশন কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন শনিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সিরাজের ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাঁহাতি পেসার চামা মিলিন্দ। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলার অভিজ্ঞতা এবার কাজে লাগাতে হবে ঘরোয়া ক্রিকেটে।
### হায়দরাবাদের অধিনায়ক সিরাজ
রঞ্জি ট্রফির নতুন মরশুমে হায়দরাবাদ দলের নেতৃত্ব দেবেন মহম্মদ সিরাজ। হায়দরাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সিলেকশন কমিটি সর্বসম্মতভাবে তাঁকে অধিনায়ক নির্বাচিত করেছে। চামা মিলিন্দকে সহ-অধিনায়ক করা হয়েছে। সিরাজ কোনও ম্যাচে অনুপস্থিত থাকলে বা খেলতে না পারলে মিলিন্দই দলের নেতৃত্ব সামলাবেন।
সিরাজের অধিনায়কত্বে হায়দরাবাদ দলের সামনে নতুন মরশুমে নিজেদের শক্তি প্রমাণের সুযোগ রয়েছে। ভারতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে দলের তরুণ ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণিত করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সামনে শুধু নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বই নয়, নিজের বোলিংয়ের ধারও ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
### ১১ অক্টোবর থেকে শুরু রঞ্জি ট্রফি
রঞ্জি ট্রফি ২০২৬-২৭ মরশুম শুরু হবে ১১ অক্টোবর থেকে। হায়দরাবাদ তাদের প্রথম ম্যাচে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে মাঠে নামবে। এই মরশুমে হায়দরাবাদকে এলিট গ্রুপ বি-তে রাখা হয়েছে। গ্রুপে রয়েছে কর্নাটক, সৌরাষ্ট্র, পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, অসম এবং ত্রিপুরা।
গ্রুপ বি-তে একাধিক শক্তিশালী দলের উপস্থিতি হায়দরাবাদের লড়াই কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে কর্নাটক ও সৌরাষ্ট্রের মতো দলের বিরুদ্ধে ভালো ফল করতে হলে ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে। অধিনায়ক সিরাজের জন্য এই মরশুম তাই গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
প্রথম ম্যাচে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করতে চাইবে হায়দরাবাদ। তবে রঞ্জি ট্রফির দীর্ঘ ফরম্যাটে একটি ম্যাচের ফল নয়, গোটা মরশুমে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই দলের সাফল্য নির্ধারণ করে। সেই কারণে সিরাজের নেতৃত্বে দলের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার বিষয়।
### দীর্ঘ বিরতির পর ছন্দে ফেরার লড়াই
সম্প্রতি মহম্মদ সিরাজের বোলিং ছন্দ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ত সূচির পর তিনি প্রায় দুই মাসের বিরতি পেয়েছিলেন। সেই বিরতির পর মাঠে ফিরে নিজের বোলিংয়ের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেতে সমস্যার কথা জানিয়েছেন ভারতীয় পেসার।
সিরাজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বোলিংয়ের ক্ষেত্রে রান-আপ এবং ছন্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ বিরতির পর সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরে সেই ছন্দ কিছুটা নষ্ট হয়েছিল। শুধু জিমে অনুশীলন বা মাঝেমধ্যে বোলিং করলেই ম্যাচের তীব্রতা পুরোপুরি পাওয়া যায় না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে রঞ্জি ট্রফি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত লাল বলের ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেলে বোলিংয়ের ছন্দ আরও মজবুত করার পাশাপাশি ম্যাচ ফিটনেসও বাড়াতে পারবেন সিরাজ। তবে তাঁর প্রকৃত পারফরম্যান্স নির্ভর করবে ম্যাচের পরিস্থিতি, ফিটনেস এবং দলের নির্বাচনের উপর।
### দুলীপ ট্রফিতে খেলেছেন সিরাজ
শ্রীলঙ্কা সফরের পর মহম্মদ সিরাজ দুলীপ ট্রফি ২০২৬-২৭ ফাইনালে সাউথ জোনের হয়ে খেলেছেন। তিলক বর্মার নেতৃত্বাধীন দলের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। চেন্নাইয়ের গরমে খেলার সময় নিজের বোলিংয়ের ছন্দ ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন ভারতীয় পেসার।
সিরাজের মতে, ম্যাচ খেলতে খেলতেই তাঁর বোলিংয়ের গতি ও ছন্দ স্বাভাবিক হতে শুরু করে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরে এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রঞ্জি ট্রফিতে হায়দরাবাদের নেতৃত্ব পাওয়ার ফলে এবার আরও বেশি সময় মাঠে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের দায়িত্ব—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সিরাজের জন্য প্রয়োজনীয় হবে। দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁকে সতীর্থদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নিজের শারীরিক সক্ষমতার দিকেও নজর দিতে হবে।
### চামা মিলিন্দের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
হায়দরাবাদ দলের সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন চামা মিলিন্দ। বাঁহাতি পেসার মিলিন্দ দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে পরিচিত নাম। সিরাজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর উপর থাকবে।
একজন সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব শুধু অধিনায়ককে সাহায্য করা নয়। মাঠে বোলিং পরিবর্তন, ফিল্ডিং সাজানো এবং দলের তরুণ ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা থাকে। সিরাজ ও মিলিন্দের নেতৃত্বে হায়দরাবাদের পেস আক্রমণ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে দলীয় সাফল্যের জন্য শুধু বোলারদের উপর নির্ভর করলে চলবে না। ব্যাটারদের বড় রান করা এবং স্পিনারদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট নেওয়াও প্রয়োজন। তাই গোটা দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্সই হায়দরাবাদের ফল নির্ধারণ করবে।
### তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বড় সুযোগ
মহম্মদ সিরাজের নেতৃত্বে খেলার সুযোগ হায়দরাবাদের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা একজন পেসারের কাছ থেকে তাঁরা ম্যাচ প্রস্তুতি, বোলিং পরিকল্পনা এবং চাপ সামলানোর নানা বিষয় শিখতে পারবেন।
রঞ্জি ট্রফি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। এই টুর্নামেন্ট থেকেই বহু ক্রিকেটার জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। তাই হায়দরাবাদের তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে নতুন মরশুম নিজেদের প্রতিভা প্রমাণ করার বড় মঞ্চ হতে চলেছে।
সিরাজ নিজেও ঘরোয়া ক্রিকেটের মাধ্যমে ভারতীয় ক্রিকেটে উঠে এসেছেন। ফলে দলের তরুণ ক্রিকেটারদের উন্নতির বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। তবে কোনও ক্রিকেটারের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত নয়; ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং নির্বাচকদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
### অধিনায়কত্বের সঙ্গে বোলিংয়ের চ্যালেঞ্জ
মহম্মদ সিরাজের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অধিনায়কত্ব এবং নিজের বোলিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। একজন পেসারকে দীর্ঘ স্পেল করতে হয়, আবার অধিনায়ক হিসেবে দলের কৌশলও ঠিক করতে হয়। দুই দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়।
বিশেষ করে রঞ্জি ট্রফির চার দিনের ম্যাচে পেসারদের উপর শারীরিক চাপ বেশি থাকে। নতুন বলে উইকেট নেওয়া, পুরনো বলে রিভার্স সুইংয়ের চেষ্টা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বোলিং করা—সবকিছুই অধিনায়ক সিরাজের পরিকল্পনার অংশ হবে।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে। তাঁর নেতৃত্বে হায়দরাবাদ কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে মাঠের সিদ্ধান্ত এবং দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের উপর।
### হায়দরাবাদের লক্ষ্য কী হতে পারে?
নতুন মরশুমে হায়দরাবাদের লক্ষ্য থাকবে গ্রুপ পর্বে ভালো ফল করা এবং পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার লড়াইয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করা। প্রথম ম্যাচে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে জয় দিয়ে শুরু করতে পারলে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
তবে গ্রুপ বি-তে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থাকায় প্রতিটি ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ। কর্নাটক, সৌরাষ্ট্র, পাঞ্জাব এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বিরুদ্ধে ভালো পারফরম্যান্স করতে হলে দলকে ধারাবাহিক থাকতে হবে।
সিরাজের নেতৃত্বে হায়দরাবাদ দলের বোলিং বিভাগ শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু ব্যাটিং বিভাগ কতটা রান করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেটে বড় পার্টনারশিপ এবং ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন হয়। তাই দলের সব ক্রিকেটারের দায়িত্বই গুরুত্বপূর্ণ।
### শেষ কথা
রঞ্জি ট্রফি ২০২৬-২৭ মরশুমে হায়দরাবাদের অধিনায়ক নির্বাচিত হয়েছেন মহম্মদ সিরাজ। সহ-অধিনায়ক হিসেবে থাকছেন চামা মিলিন্দ। ১১ অক্টোবর ত্রিপুরার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে হায়দরাবাদের অভিযান শুরু হবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলা সিরাজ এবার ঘরোয়া ক্রিকেটে নেতৃত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর সামনে যেমন দলের সাফল্য আনার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনই নিজের বোলিংয়ের ছন্দ ধরে রাখার সুযোগও রয়েছে। হায়দরাবাদের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্যও এই মরশুম হতে পারে নিজেদের প্রমাণ করার বড় মঞ্চ।
রঞ্জি ট্রফির নতুন মরশুমে সিরাজের নেতৃত্বে হায়দরাবাদ কতটা সফল হয়, সেদিকেই নজর থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের।


