দেশে দূষণ কমানো, জ্বালানি আমদানি হ্রাস করা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকার কয়েক বছর ধরেই ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহারে জোর দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই দেশের বহু জায়গায় ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত **E20** পেট্রোল চালু হয়েছে। তবে এই জ্বালানিকে ঘিরে সাধারণ গাড়িচালক, অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পমহলের একাংশের উদ্বেগের জেরে এবার ২৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত **E25** জ্বালানির পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
সূত্রের খবর, E20 জ্বালানি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে, তা খতিয়ে দেখছে কেন্দ্র। বিশেষ করে পুরনো গাড়ির সঙ্গে E20-এর সামঞ্জস্য, ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা, মাইলেজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে E25 চালুর আগে আরও বিস্তারিত মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ইথানল মূলত আখ, ভুট্টা, ধান এবং অন্যান্য কৃষিজাত ফসল থেকে তৈরি একটি জৈব জ্বালানি। পেট্রোলের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার করলে অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমে এবং কার্বন নিঃসরণও কিছুটা হ্রাস পায়। সেই কারণেই ভারত সরকার ধাপে ধাপে ইথানল মিশ্রণের হার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছিল।কিন্তু বাস্তবে E20 চালুর পর বহু গাড়ির মালিক অভিযোগ করেছেন, পুরনো মডেলের গাড়িতে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্সে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি দক্ষতা কমেছে বলেও দাবি উঠেছে। যদিও সমস্ত অভিযোগ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়, তবুও এই বিষয়গুলি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক।
অটোমোবাইল শিল্পের একাংশের মতে, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া সব গাড়িই E20-এর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে ২০২৩ সালের আগে তৈরি বহু গাড়িতে উচ্চমাত্রার ইথানল ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যার কারণ হতে পারে। ফলে E25 চালু করার আগে গাড়ি নির্মাতাদের আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
এছাড়া জ্বালানি বিপণন সংস্থাগুলির পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সরবরাহ চেইন এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানানো হয়েছে। দেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে নিরবচ্ছিন্নভাবে E25 সরবরাহ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশবিদদের মতে, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত সুবিধা রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো গেলে কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা সমানভাবে জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনও E25 প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়নি। বরং বিভিন্ন দফতর, অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে E25 চালু হলেও তা নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, বিকল্প জ্বালানির ক্ষেত্রে শুধু ইথানল নয়, বৈদ্যুতিক গাড়ি, হাইব্রিড প্রযুক্তি, সিএনজি এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো বিকল্পগুলিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থায় একাধিক প্রযুক্তি একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমানে দেশের জ্বালানি নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানো। সেই লক্ষ্য পূরণে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সাধারণ মানুষের সুবিধা, যানবাহনের নিরাপত্তা এবং শিল্পের প্রস্তুতির বিষয়গুলি বিবেচনা করেই কেন্দ্র সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। তাই E25 জ্বালানির বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


