বাংলায় পা রেখেই ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনার সাক্ষী হয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার ক্যাফু। দু’দিনের বঙ্গ সফরে রবিবার দার্জিলিং এবং সোমবার কলকাতায় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অধিনায়ক। কলকাতায় এসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন প্রাক্তন ব্রাজিল অধিনায়ক। সাক্ষাৎ ঘিরে ফুটবলমহলে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ।
ক্যাফুর এই সফরের মূল বার্তা ছিল ভারতে ফুটবলের পরিকাঠামো ও তৃণমূলস্তরের প্রতিভা বিকাশে আরও জোর দেওয়া। বিশেষ করে স্কুলস্তর থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলের চর্চা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
### দার্জিলিংয়ে তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে ক্যাফু
রবিবার দার্জিলিংয়ের লেবংয়ের গোর্খা স্টেডিয়ামে পৌঁছন ক্যাফু। তাঁকে দেখতে সেখানে ভিড় করেন বহু ফুটবলপ্রেমী এবং তরুণ খেলোয়াড়। শুধু দর্শকদের সঙ্গে দেখা করেই থেমে থাকেননি তিনি, মাঠে নেমে শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন এবং একটি প্রদর্শনী ম্যাচেও অংশ নেন।
সেখানে ক্যাফু বলেন, স্কুলস্তর থেকেই শিশুদের ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। তবে ফুটবল খেললেও পড়াশোনাকে অবহেলা করা যাবে না। তাঁর মতে, একজন তরুণ খেলোয়াড়ের সামগ্রিক বিকাশের জন্য শিক্ষা এবং খেলাধুলা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
### নতুন দুই ফুটবল দলের আত্মপ্রকাশ
ক্যাফুর দার্জিলিং সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দুটি নতুন ফুটবল দলের আত্মপ্রকাশ। আরিয়া টি কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে **Darjeeling Warriors FC** এবং **North Bengal Fighters FC**। এই দুই দলের সঙ্গে ফুটবল অ্যাকাডেমিও তৈরি করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করা এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
Darjeeling Warriors মূলত পাহাড়ের তরুণ ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করবে। অন্যদিকে North Bengal Fighters FC-র নজরে থাকবে শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, মালদহ এবং দুই দিনাজপুরের প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা। ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ ফুটবলার এবং কোচদের এনে প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের পরিকল্পনাও রয়েছে।
### ক্রীড়া পর্যটনেও নতুন ভাবনা
ক্যাফুর সফরের সঙ্গে যুক্ত ছিল ক্রীড়া ও পর্যটনের মেলবন্ধনের পরিকল্পনাও। দার্জিলিংয়ের আরিয়া টি এস্টেটে প্রস্তাবিত **Sidra Hills Sports & Wellness Resort**-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নেন ক্যাফু। প্রায় ৪০ একর জমিতে প্রায় ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প গড়ে ওঠার কথা। সেখানে ১০০-র বেশি বিলাসবহুল ঘর ও ভিলার পাশাপাশি ফুটবল, বাস্কেটবল, টেনিস-সহ বিভিন্ন ক্রীড়া পরিকাঠামো এবং অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩১ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
### কলকাতায় ‘Future of Football in India’ নিয়ে আলোচনা
দার্জিলিংয়ের পর সোমবার কলকাতায় একটি বিশেষ আলোচনাসভায় যোগ দেন ক্যাফু। Bengal National Chamber of Commerce and Industry (BNCCI)-র উদ্যোগে আয়োজিত ‘The Future of Football in India’ অনুষ্ঠানে ভারতের ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে তৃণমূলস্তরে প্রতিভা খোঁজা, যুব ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া পরিকাঠামো এবং ফুটবলকে ঘিরে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনায় জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রামকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে পর্যটন, অ্যাকাডেমি, প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পণ্য, আতিথেয়তা এবং যুব উদ্যোগের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
### ভারতের ফুটবলের উন্নতিতে কী পরামর্শ ক্যাফুর?
ক্যাফুর বক্তব্যের মূল সুর—ভারতের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শুধু জাতীয় দলের দিকে তাকালে হবে না। স্কুল এবং অ্যাকাডেমি স্তর থেকেই খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। উন্নত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
তাঁর সফর থেকে স্পষ্ট, ভারতের ফুটবল নিয়ে আন্তর্জাতিক তারকাদের আগ্রহও বাড়ছে। ক্যাফু নিজেও তরুণদের উদ্দেশে কঠোর পরিশ্রম, লক্ষ্য স্থির রাখা এবং শিক্ষার সঙ্গে ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
### সামনে কলকাতায় ব্রাজিল বনাম ভারত
ক্যাফুর বঙ্গ সফরের সময়েই কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন আরও বড় একটি ম্যাচের দিকে। আগামী **৩ অক্টোবর কলকাতায় ভারত-ব্রাজিল আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ** হওয়ার কথা। AIFF সভাপতি কল্যাণ চৌবে জানিয়েছেন, এই ম্যাচ আয়োজনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এই ম্যাচ ভারতের জন্য ঐতিহাসিক বলেই মনে করছে AIFF। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত প্রথমবারের মতো ঘরের মাঠে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ FIFA র্যাঙ্কিংয়ের একটি দলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে চলেছে। ব্রাজিল বর্তমানে FIFA র্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে, আর ভারত রয়েছে অনেক পিছনে।
### বিশ্বকাপজয়ী ক্যাফুর বর্ণময় ফুটবল কেরিয়ার
ক্যাফু শুধু ব্রাজিলের প্রাক্তন অধিনায়ক নন, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল ডিফেন্ডার। তাঁর আসল নাম Marcos Evangelista de Moraes। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬—টানা চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলেছেন তিনি। টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা একমাত্র ফুটবলারও ক্যাফু। ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জেতেন তিনি। ২০০২ সালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের সময় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্যাফু।
এর আগে ২০২২ সালেও কলকাতায় এসেছিলেন ক্যাফু। সেবার কলকাতা পুলিশ ফ্রেন্ডশিপ কাপে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন তিনি।
### বাংলার ফুটবলে ক্যাফুর সফরের তাৎপর্য
দার্জিলিংয়ের মাঠ থেকে কলকাতার শিল্প ও ক্রীড়া আলোচনাসভা—ক্যাফুর এবারের সফর বাংলায় ফুটবলকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে। একদিকে উত্তরবঙ্গের প্রতিভাবান ফুটবলারদের তুলে আনার উদ্যোগ, অন্যদিকে কলকাতায় ভারত-ব্রাজিল ম্যাচের প্রস্তুতি—দুই ঘটনাই বাংলার ফুটবলমহলে বাড়তি উৎসাহ তৈরি করেছে।
ক্যাফুর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারীর সাক্ষাৎও সেই বৃহত্তর ফুটবল পরিকাঠামো ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলার মাটিতে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের উপস্থিতি যে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আবেগের, তা তাঁর দার্জিলিং সফরেই স্পষ্ট হয়েছে।


