উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে ফের বড়সড় ভূমিধসের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে। মিরিকের মিরিক বস্তি-২ এলাকায় পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অংশ ধসে রংভং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ কার্যত আটকে গিয়েছে। ধসের সঙ্গে নেমে আসা মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীর পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে বিপুল পরিমাণ জল জমে তৈরি হয়েছে একটি কৃত্রিম হ্রদ। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সেই জল নিরাপদে বের করে দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের কর্মীরা।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তৈরি হওয়া জলাধারটির প্রস্থ প্রায় ৭০ মিটার এবং গভীরতা প্রায় ৩ মিটার। ভারী বৃষ্টি হলে জলাধারের পাড় দুর্বল হয়ে আচমকা জল নেমে আসতে পারে—এই আশঙ্কাতেই প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
### ৩৩ পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরানো হয়েছে
ভূমিধসের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মাঙ্গারজং চা বাগান, লোয়ার পালজারগাঁও এবং মিরিক বস্তি-২ সংলগ্ন এলাকায়। লাবারবোটার লোয়ার পালজারগাঁওয়ের ৩৩টি পরিবারের মোট ১২৪ জনকে ইতিমধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দার্জিলিং জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
প্রশাসনের পাশাপাশি বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞ দল পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। জলাধারের পাড় কতটা স্থিতিশীল, নদীর জল কোন পথে বইছে এবং নতুন করে কোথাও ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে কি না—সবকিছু পরীক্ষা করা হচ্ছে।
### নদী বিশেষজ্ঞদের মত, বড় হড়পা বানের আশঙ্কা কম
রংভং নদী সমতলে এসে শিলিগুড়ির কাছে বালাসন নদীর সঙ্গে মিশেছে। ফলে মিরিক থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নামসু, রংভং, দুধিয়া এবং তরাই এলাকার মানুষকে নদীর কাছাকাছি না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে নদী বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পরিস্থিতি খারাপ হলেও এটিকে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না। রংভং নদীর জলধারণ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় জলাধার ভেঙে গেলে ভয়াবহ হড়পা বানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আকস্মিক প্লাবনের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
### বুধবার থেকে ধস, শুক্রবার বড় বিপর্যয়
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, পাইলা গাঁও পাহাড়ের ঢালে বুধবার রাত থেকেই ভূমিধসের সূত্রপাত। শুক্রবার পাহাড়ের বড় অংশ ভেঙে নদীর দিকে নেমে আসে। পরবর্তী সময়েও ধসের ঘটনা ঘটে। মাটি ও পাথরের স্তূপ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেওয়ার পর সেখানে জল জমতে শুরু করে।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সাংসদ রাজু বিস্তা, কার্শিয়াংয়ের বিধায়ক সোনাম লামা, দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক ও পুলিশ আধিকারিকরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। উদ্ধার ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
### তিস্তায়ও কমল আশঙ্কা, স্বাভাবিকের পথে জলপ্রবাহ
অন্যদিকে উত্তর সিকিমের মাঙ্গান জেলাতেও ভূমিধসের জেরে তিস্তা ও চ্যাকুং নদীর প্রবাহে সাময়িক বাধা তৈরি হয়েছিল। নর্থ সিকিমের চুংথাং সাবডিভিশনের কাছে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ভেঙে নদীপথে পড়ায় জল জমার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনাটি নিয়ে সিকিমের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের তিস্তাপাড়েও সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
তবে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে তিস্তার জলপ্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। জলস্তরও নেমেছে। যদিও নদীর জল এখনও ঘোলা এবং নিচের দিকের এলাকাগুলিতে সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।
### উত্তরবঙ্গে ফের বর্ষার দুর্যোগের আশঙ্কা
মিরিকের এই পরিস্থিতি গত বছরের ভয়াবহ উত্তরবঙ্গের বন্যা ও ভূমিধসের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে। দার্জিলিং, মিরিক, সুখিয়াপোখরি-সহ পাহাড়ের একাধিক এলাকায় প্রবল বৃষ্টিতে ধস ও যোগাযোগ বিপর্যয় হয়েছিল। একাধিক রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং প্রাণহানিও ঘটেছিল।
এবারও পাহাড়ে বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কার মধ্যে প্রশাসনের মূল লক্ষ্য নদীর গতিপথ নিরাপদ রাখা এবং কৃত্রিম জলাধারে জমে থাকা জল নিয়ন্ত্রিতভাবে বের করে দেওয়া। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলাধারের পাড় দুর্বল হয়ে আচমকা ভেঙে গেলে নিচের দিকে জল নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
### প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত
মিরিকে নদীর পথ খুলে দেওয়ার কাজ শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দল জলাধার ও নদীর গতিপথ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। একইসঙ্গে নতুন করে কোথাও পাহাড় ধসছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
সিকিমে তিস্তার পরিস্থিতির উন্নতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও মিরিকের রংভং নদীর কৃত্রিম জলাধার এখন প্রশাসনের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি যাতে নতুন করে ভয়াবহ না হয়ে ওঠে, সেজন্য পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।



