দেশজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও কড়া অবস্থান নিল ভারতের খাদ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা **ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (FSSAI)**। একটি নামী খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থার বিরুদ্ধে পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য বিক্রির অভিযোগে ইতিমধ্যেই মোট **৯টি নোটিস** জারি করেছে সংস্থাটি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন রাজ্য থেকে ওই সংস্থার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ছিল। ক্রেতাদের অভিযোগ ছিল, অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমেই এমন কিছু খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হয়েছে, যেগুলির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল অথবা সেগুলির গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে FSSAI।
তদন্ত চলাকালীন বিভিন্ন গুদাম, ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার এবং বিক্রয় কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় কয়েকটি ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানা গিয়েছে। এরপরই সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কারণ দর্শানোর জন্য একের পর এক মোট ৯টি নোটিস পাঠানো হয়।
FSSAI জানিয়েছে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী প্রতিটি খাদ্য প্রস্তুতকারী, সংরক্ষণকারী এবং বিক্রেতার দায়িত্ব হল নির্ধারিত মান বজায় রেখে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করা। কোনও অবস্থাতেই মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট খাবার বিক্রি করা আইনসঙ্গত নয়। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংস্থার বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত অথবা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অনলাইন ফুড ডেলিভারি এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে খাদ্যপণ্যের গুণমান বজায় রাখা আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংরক্ষণের ত্রুটি, পরিবহণে গাফিলতি অথবা পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনেক সময় খাবারের মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আরও মত, শুধু উৎপাদনকারী সংস্থা নয়, সরবরাহকারী, গুদাম পরিচালনাকারী এবং বিক্রেতা—সকলেরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। খাদ্যপণ্য যথাযথ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, মেয়াদ নিয়মিত পরীক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য দ্রুত বাজার থেকে সরিয়ে ফেলা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে, ভোক্তা সংগঠনগুলিও এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তাদের দাবি, খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ একটি মেয়াদোত্তীর্ণ বা দূষিত খাদ্যপণ্য শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
FSSAI সাধারণ মানুষকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে। কোনও খাদ্যপণ্য কেনার আগে অবশ্যই **উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, প্যাকেটের অবস্থা এবং FSSAI লাইসেন্স নম্বর** পরীক্ষা করে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যদি কোনও পণ্যের গুণমান নিয়ে সন্দেহ থাকে, তবে সেটি ব্যবহার না করে অবিলম্বে বিক্রেতা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর জন্য FSSAI-এর নির্ধারিত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও রয়েছে। সেখানে ভোক্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ জমা দিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং FSSAI-এর পাঠানো নোটিসের যথাযথ উত্তর দেওয়া হবে। যদি কোথাও কোনও ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তা দ্রুত সংশোধন করার আশ্বাসও দিয়েছে সংস্থাটি।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই বাজারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। কেনাকাটার সময় সামান্য সতর্কতা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
সব মিলিয়ে, পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রির অভিযোগে FSSAI-এর জারি করা ৯টি নোটিস আবারও স্পষ্ট করে দিল যে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও রকম আপস করতে রাজি নয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।


