ফুটবলপ্রেমীদের জন্য আরেকটি রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ উপহার দিল ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দুই শক্তিশালী দলের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে পৌঁছে গেল ইংল্যান্ড। তবে ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি চর্চায় উঠে এসেছে বিতর্কিত কয়েকটি রেফারিং সিদ্ধান্ত এবং জুড বেলিংহ্যামের দুরন্ত পারফরম্যান্স।
শুরু থেকেই ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে দেখা যায় দুই দলকে। ইংল্যান্ড দ্রুত বলের দখল নেওয়ার চেষ্টা করলেও নরওয়েও পাল্টা আক্রমণে সমানভাবে বিপজ্জনক ছিল। মাঝমাঠে জুড বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইস এবং ফিল ফোডেনের সমন্বয়ে ইংল্যান্ড নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়। অন্যদিকে, নরওয়ের আক্রমণের মূল ভরসা ছিল দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং লম্বা পাসের কৌশল।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই ইংল্যান্ড গোলের সুযোগ তৈরি করলেও নরওয়ের রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক একাধিকবার দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বাঁচান। তবে মাঝমাঠে বেলিংহ্যামের উপস্থিতি ক্রমশ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে শুরু করে। তাঁর নিখুঁত পাস, বল কন্ট্রোল এবং আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা ইংল্যান্ডকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর নরওয়ে দ্রুত সমতা ফেরায়। এরপর ম্যাচের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত সামনে আসে। নরওয়ে একটি সম্ভাব্য পেনাল্টির দাবি জানালেও রেফারি সেটি নাকচ করে দেন। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নরওয়ের ফুটবলাররা রেফারির সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলেও সিদ্ধান্ত বদলানো হয়নি।
এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পরই ম্যাচের গতি পুরোপুরি ইংল্যান্ডের দিকে ঘুরে যায়। জুড বেলিংহ্যাম মাঝমাঠ থেকে দুর্দান্ত একটি মুভ তৈরি করেন, যা শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জয়সূচক গোলে পরিণত হয়। যদিও গোলটি নিয়ে অফসাইড ও ফাউলের অভিযোগ তুলেছিল নরওয়ে, কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) গোলটি বৈধ বলে ঘোষণা করে।
বেলিংহ্যাম শুধু আক্রমণেই নয়, রক্ষণেও অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। প্রতিপক্ষের একাধিক আক্রমণ নস্যাৎ করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ গড়ে তোলেন তিনি। ম্যাচ শেষে সমর্থক এবং ফুটবল বিশেষজ্ঞদের অনেকেই তাঁকে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, নরওয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমতা ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা চালায়। একাধিক কর্নার এবং ফ্রি-কিক পেলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ অত্যন্ত সংগঠিত ফুটবল খেলায় কোনও সুযোগ দেয়নি। গোলরক্ষকও চাপের মুখে গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলের জয় নিশ্চিত করেন।
এই জয়ের ফলে আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেল ইংল্যান্ড। দলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। কোচ ম্যাচ শেষে বলেন, কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই জয় পুরো দলের পরিশ্রম এবং মানসিক দৃঢ়তার ফল। বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে ফুটবলারদের শান্ত থাকা জয়ের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।তবে ম্যাচের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে রেফারিং নিয়ে।
নরওয়ের সমর্থক এবং ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, পেনাল্টির আবেদন খারিজ এবং দ্বিতীয় গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউল—এই দুই সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সমর্থকদের মতে, VAR সমস্ত কিছু যাচাই করেই গোলের অনুমোদন দিয়েছে, তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের কোনও কারণ নেই।
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবলে VAR ব্যবস্থার ব্যবহার বিতর্ক কমানোর জন্য হলেও অনেক সময় তার সিদ্ধান্ত নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। এই ম্যাচও তার ব্যতিক্রম নয়। আগামী কয়েকদিন আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে এই ম্যাচের বিভিন্ন মুহূর্ত নিয়ে আলোচনা চলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তবে বেলিংহ্যামের বর্তমান ফর্ম, দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং আক্রমণভাগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে শিরোপার দৌড়ে ইংল্যান্ড যে অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার, তা এই ম্যাচ আরও একবার প্রমাণ করে দিল।


