পথসভা, মিছিল, সভা কিংবা মঞ্চ থেকে দীর্ঘ বক্তৃতা—বাম রাজনীতির সঙ্গে এমন ছবিই দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সিপিএম। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে Gen Z-র কাছে পৌঁছতে এবার গান, র্যাপ, সরাসরি প্রশ্নোত্তর এবং QR কোডের মতো নতুন মাধ্যমকে সামনে আনল তারা। বৃহস্পতিবার বারাসতের রবীন্দ্রভবনে আয়োজিত ‘প্রজন্মের ডাক’ অনুষ্ঠানে সেই নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগের ছবি দেখা গেল।
### মিছিল-মিটিংয়ের বাইরে নতুন ভাবনা
বারাসতের এই কর্মসূচির আয়োজনে সরাসরি সিপিএমের দলীয় ব্যানারকে সামনে রাখা হয়নি। ‘বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কালচারাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়। তবে এর নেপথ্যে সিপিএমের তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এমনভাবে যোগাযোগ তৈরি করা, যাতে প্রচলিত রাজনৈতিক সভার একঘেয়ে কাঠামোর বাইরে গিয়ে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়।
অনুষ্ঠানের নামও সেই ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—‘প্রজন্মের ডাক’। মঞ্চে ছিল জাতীয় পতাকা এবং গণসঙ্গীত। তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয় র্যাপ গান ও সরাসরি কথোপকথন। ফলে একদিকে বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তরুণদের পরিচিত সাংস্কৃতিক মাধ্যমও ব্যবহার করা হয়েছে।
### QR কোডে প্রশ্ন, মঞ্চ থেকে উত্তর
এই অনুষ্ঠানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল QR কোডের ব্যবহার। উপস্থিত দর্শকদের শুধু হলের মধ্যে বসে বক্তৃতা শোনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেশের ও রাজ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন পাঠানোর জন্য QR কোড স্ক্যান করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ, প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূর থেকেই প্রশ্ন পাঠানো যায়। পরে সেই প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিএমের তরুণ নেতৃত্বের একাধিক মুখ। এই তালিকায় ছিলেন আকাশ কর, দীপ্সিতা ধর, ঐশী ঘোষ এবং আফরিন বেগম।
রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ Gen Z-র দৈনন্দিন যোগাযোগের বড় অংশই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইলকেন্দ্রিক। সেই অভ্যাসকে মাথায় রেখেই রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেও প্রযুক্তিকে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা গেল।
### মঞ্চে র্যাপ, সঙ্গে গণসঙ্গীত
তরুণদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিই নয়, সংস্কৃতিকেও হাতিয়ার করেছে সিপিএম। অনুষ্ঠানে বামপন্থী মনস্ক শিল্পী আরাত্রিকা সিনহা এবং রৌনক চক্রবর্তী গান পরিবেশন করেন। পাশাপাশি গণসঙ্গীতের সঙ্গে রাখা হয় র্যাপের পরিবেশনাও।
এই সংমিশ্রণটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গণসঙ্গীত বামপন্থী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। অন্যদিকে র্যাপ Gen Z-র কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি সংগীতধারা। ফলে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ভাষাকে এক মঞ্চে আনার চেষ্টা হয়েছে এই অনুষ্ঠানে।
### ছাত্র রাজনীতি থেকে যাদবপুর, উঠে এল নানা প্রসঙ্গ
শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না ‘প্রজন্মের ডাক’। বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে বামপন্থী আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, হকার উচ্ছেদ এবং সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার মতো বিভিন্ন বিষয়। বক্তব্য রাখেন ছাত্র নেতা সৌভিক দাস বক্সি, এশনা, আকাশ কর এবং ঐশী ঘোষ।
তরুণদের সামনে এমন বিষয় তুলে ধরার লক্ষ্য ছিল তাঁদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির যোগ তৈরি করা। শুধুমাত্র দলের ইতিহাস বা পুরনো আন্দোলনের কথা বলার বদলে বর্তমান সময়ের সমস্যা নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার চেষ্টা হয়েছে।
### কেন Gen Z-র দিকে নজর সিপিএমের?
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর সিপিএম এখন রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় ধাক্কার মুখে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে দলের দূরত্ব কমানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে নেতৃত্বের একাংশ। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সদস্যসংখ্যা কমে যাওয়ার মতো বিষয়ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র ও যুব আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনাও বাম নেতৃত্বের নজরে এসেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরের ছাত্র আন্দোলন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাবলি তরুণ সমাজের রাজনৈতিক সক্রিয়তার দিকে নতুন করে নজর ফেরানোর কারণ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও Gen Z-র সঙ্গে দূরত্ব কমানোর বিষয়টি উঠে এসেছে বলে অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়নকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে তরুণদের সমস্যা ও ক্ষোভকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
### শুধু ভোট নয়, সম্পর্ক তৈরির চেষ্টাও?
Gen Z-কে কাছে টানার এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখলে ছবির একটি অংশই ধরা পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি করা এবং তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখাও এর লক্ষ্য হতে পারে।
সিপিএমের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ঘোষণাপত্রেও যুব কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং তরুণদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরা হয়েছে। দলের প্রস্তাবিত ‘নেতাজী সুভাষ যুবসেবক প্রকল্প’-এর মাধ্যমে যুবকদের সমাজসেবা, উৎপাদনমুখী ও উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।
তবে ঘোষণাপত্রে কী বলা হচ্ছে আর তরুণ ভোটারদের কাছে সেই বার্তা কীভাবে পৌঁছচ্ছে—দুটি বিষয় এক নয়। বারাসতের ‘প্রজন্মের ডাক’ সেই যোগাযোগের মাধ্যম বদলের একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
### পুরনো রাজনীতি, নতুন যোগাযোগের ভাষা
বারাসতের অনুষ্ঠান থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হল—সিপিএম তরুণদের কাছে পৌঁছতে শুধু পুরনো রাজনৈতিক স্লোগান বা প্রচলিত সভার কাঠামোর উপর নির্ভর করতে চাইছে না। QR কোড, ডিজিটাল প্রশ্নোত্তর, র্যাপ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা হয়েছে।
এই উদ্যোগ কতটা Gen Z-র মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে, তা অবশ্য সময়ই বলবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলে তরুণদের পছন্দের মাধ্যম ব্যবহার করার যে চেষ্টা শুরু হয়েছে, বারাসতের ‘প্রজন্মের ডাক’ কর্মসূচি তারই স্পষ্ট বার্তা।


