দুর্গাপুজোয় বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়ার রীতি নিয়ে বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক এবার আরও তীব্র হল। তাঁর ছবিতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে এক কংগ্রেস নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কলকাতার ভবানীপুর থানা চত্বরে বাগেশ্বর বাবার ছবি পোড়ানোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। সেই ঘটনার পরই অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। বাংলার দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাওয়ার দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিকে নিয়ে বাইরে থেকে কোনও ধর্মীয় নেতা নির্দেশ দিতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সেই আবহেই ছবি পোড়ানোর ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
### কী ঘটেছিল ভবানীপুরে?
অভিযোগ, বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের প্রতিবাদে ভবানীপুর থানার সামনে বিক্ষোভ দেখানোর সময় তাঁর ছবিতে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ছবি পোড়ানোর ভিডিও ও ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
এরপরই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কোনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যের বিরোধিতা করা যেতে পারে, কিন্তু ছবি পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানানোর ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না।
### কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
পুলিশের পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছে বাগেশ্বর বাবার ছবিতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ। কংগ্রেসের তরফে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিবাদের সময় ছবি পোড়ানো হয়েছে কি না, কে সরাসরি ওই কাজে যুক্ত ছিলেন এবং ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন—তা তদন্তের বিষয়।
প্রাথমিকভাবে এই ঘটনার সঙ্গে কংগ্রেস কর্মী ও নেতাদের নাম উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ছবি পোড়ানোর ঘটনায় এক কংগ্রেস নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। তদন্ত শেষে পুলিশ কী প্রমাণ পায় এবং আদালতে অভিযোগ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তার উপর পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
অন্যদিকে কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়েছে, দল বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ করেছে। তবে ছবি পোড়ানোর অভিযোগ নিয়ে দলের অবস্থান এবং অভিযুক্ত নেতার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে সামনে আসার পরেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
### কী মন্তব্য করেছিলেন বাগেশ্বর বাবা?
বিতর্কের সূত্রপাত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর দুর্গাপুজো সংক্রান্ত মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি দুর্গাপুজো ও নবরাত্রির সময়ে মাছ-মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দেন। এমনকি যাঁরা এই সময়ে আমিষ খাবার খান, তাঁদের ‘পাখণ্ডী’ বা ভণ্ড বলেও মন্তব্য করেছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মন্তব্যেই ক্ষুব্ধ হন বাংলার বহু মানুষ। কারণ, বাঙালির দুর্গাপুজোর সঙ্গে মাছ-মাংস খাওয়ার রীতি বহু পরিবারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। অনেক পরিবারে পুজোর নির্দিষ্ট দিনে আমিষ রান্না করা হয়। ফলে এই রীতিকে বাইরে থেকে ‘ভণ্ডামি’ বলা বা তা বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়াকে বাংলার সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
### বিজেপির নেতারাও দূরত্ব বজায় রেখেছেন
বাগেশ্বর বাবার বক্তব্য নিয়ে শুধু বিরোধী দল নয়, বিজেপির একাধিক নেতাও প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ, সজল ঘোষ এবং অগ্নিমিত্রা পাল-সহ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, বাংলার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বাইরের কোনও ব্যক্তির নির্দেশ মেনে চলার প্রশ্ন নেই। তাঁদের বক্তব্য, বাঙালির পুজোর সঙ্গে মাছ-মাংস খাওয়ার ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।
তবে একইসঙ্গে বিজেপি নেতৃত্ব ছবি পোড়ানো বা উত্তেজনামূলক প্রতিবাদের বিরোধিতা করেছে। তাঁদের বক্তব্য, কারও মন্তব্যের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলে রাজনৈতিকভাবে তার জবাব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা কোনও ব্যক্তির ছবি পোড়ানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
### শুভেন্দুর কড়া বার্তা
ছবি পোড়ানোর ঘটনায় কড়া অবস্থান নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, কোনও ধর্মীয় নেতা নিজের বিশ্বাস, ধর্মীয় রীতি বা খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে মত প্রকাশ করতেই পারেন। কেউ সেই মত মানবেন কি না, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু মতের বিরোধিতা করতে গিয়ে ছবি পোড়ানো বা হিংসাত্মক আচরণ মেনে নেওয়া হবে না।
মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেছেন, ভবানীপুর থানার সামনে পুলিশের উপস্থিতিতেই ছবি পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণেই অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তাঁর এই বক্তব্যের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তরফে প্রশ্ন উঠতে পারে—প্রতিবাদের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে। কারণ, একদিকে বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবাদের নামে কোনও ব্যক্তির ছবি পোড়ানো বা উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ থাকলে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
### কংগ্রেসের প্রতিবাদ কেন?
বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পর কলকাতা কংগ্রেসের তরফে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল। দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ প্রসাদ ভবানীপুর থানায় অভিযোগ জানান বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়, বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য বাঙালির ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আঘাত করেছে।
কংগ্রেসের বক্তব্য, দুর্গাপুজোর সময়ে বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে বাইরের কোনও ধর্মীয় নেতার মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের মতে, বাঙালির পুজো, খাবার এবং সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলার মানুষেরই রয়েছে।
তবে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ছবি পোড়ানোর অভিযোগ সামনে আসায় মূল ইস্যু থেকে বিতর্কের দিক বদলে গিয়েছে। বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য নিয়ে আলোচনা এখন পুলিশের গ্রেপ্তার, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংঘাতের দিকেও ঘুরে গিয়েছে।
### ধর্মীয় মন্তব্য থেকে রাজনৈতিক সংঘাত
এই ঘটনা শুধু ধর্মীয় বা খাদ্যাভ্যাসের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গাপুজোর আগে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়, বাইরের নেতাদের মন্তব্য এবং রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান—সব মিলিয়ে বিষয়টি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
একদিকে বাগেশ্বর বাবার বক্তব্যকে সমর্থন করে কিছু সংগঠন পুজোর সময় নিরামিষ খাবারের পক্ষে সওয়াল করছে। অন্যদিকে বাংলার বহু মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতা বলছেন, পুজোর সময়ে কী খাবেন, তা প্রত্যেক পরিবারের ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত।
এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। তাই পুলিশ ও প্রশাসনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হল, প্রতিবাদের অধিকার বজায় রেখেও উত্তেজনা ও সংঘর্ষ এড়ানো।
### গ্রেপ্তারের পর কী হতে পারে?
অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতাকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ ঘটনার ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ খতিয়ে দেখতে পারে। ছবি পোড়ানোর ঘটনায় তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না, তিনি অন্যদের উসকানি দিয়েছিলেন কি না এবং ঘটনাটি কোন ধারায় পড়ে—এসব তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা হলে তাঁকে আদালতে তোলা হবে। সেখানেই পরবর্তী হেফাজত, জামিন এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে গ্রেপ্তারকে চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়া হিসেবে দেখা যাবে না।
সব মিলিয়ে, বাগেশ্বর বাবার মাছ-মাংস সংক্রান্ত মন্তব্যের প্রতিবাদে কলকাতায় ছবি পোড়ানোর অভিযোগে কংগ্রেস নেতার গ্রেপ্তার রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে। একদিকে বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের ছবি পোড়ানোর অভিযোগ—দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সংঘাতের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা কীভাবে উঠে আসে এবং আদালতে অভিযোগের কী পরিণতি হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।


