রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মুর্শিদাবাদের এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রাজনৈতিক উত্তাপ ততই বাড়ছে। তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের মতো করে প্রচার শুরু করেছে। এরই মধ্যে রেজিনগরে ‘নীরব মুসলিম ভোটার’-দের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে কংগ্রেস। প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য না করলেও যে ভোটাররা শেষ মুহূর্তে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানান, তাঁদের সমর্থনই নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে দলটি।
রেজিনগর ঐতিহাসিকভাবে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। ফলে এখানে মুসলিম ভোটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে এবারের উপনির্বাচনে ভোটের অঙ্ক আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়েছে।
## কংগ্রেসের প্রার্থী মহম্মদ আবদুল্লাইল কাফি
রেজিনগর আসনে কংগ্রেস প্রার্থী করেছে মহম্মদ আবদুল্লাইল কাফিকে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর প্রার্থিতায় অনুমোদন দিয়েছে। একইসঙ্গে নন্দীগ্রাম আসনে মিলন প্রধানকে প্রার্থী করেছে কংগ্রেস। ফলে দুই কেন্দ্রেই সংগঠনকে সক্রিয় করে ভোটে নামার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
রেজিনগরে কাফির প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের লক্ষ্য স্পষ্ট—পুরনো সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভোটের রাজনীতিতে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কংগ্রেসের নিজস্ব ভোটব্যাঙ্কের একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়েছে। এবার সেই ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছতে চাইছে দল।
কংগ্রেসের আশা, যাঁরা প্রকাশ্যে কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না, তাঁদের বড় অংশ ভোটের দিন দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে পারেন। সেই কারণেই ‘নীরব ভোটার’দের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
## ‘নীরব ভোটার’ কারা?
রাজনীতিতে ‘নীরব ভোটার’ বলতে সাধারণত সেই ভোটারদের বোঝানো হয়, যাঁরা প্রকাশ্যে কোনও দলের সমর্থনে কথা বলেন না। তাঁরা সভা-মিছিলে অংশ নেন না, সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করেন না এবং অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের কাছেও নিজেদের পছন্দ স্পষ্ট করেন না।
কিন্তু ভোটের দিন তাঁরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেক ভোটার প্রকাশ্যে কোনও দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও গোপনে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেন। আবার অনেকে স্থানীয় সমস্যা, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক পরিবেশ বিচার করে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন।
রেজিনগরে কংগ্রেস এই ভোটারদেরই নিজেদের দিকে টানতে চাইছে। দলের প্রচারে তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, স্থানীয় সমস্যা ও মানুষের দৈনন্দিন অসুবিধার বিষয়গুলিকেও সামনে আনা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
## তৃণমূলের সঙ্গে জোট না হওয়ায় নতুন সমীকরণ
রেজিনগর উপনির্বাচনে তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়নি। তৃণমূলের তরফে নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থনের বিনিময়ে রেজিনগরে কংগ্রেসের প্রার্থী প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে খবর। কিন্তু কংগ্রেস সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ফলে দুই দলই পৃথকভাবে নির্বাচনে লড়াই করছে।
এই জোট ভেঙে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রেজিনগরের ভোটে। কারণ, তৃণমূল ও কংগ্রেস—দুই দলেরই সংখ্যালঘু ভোটের উপর দাবি রয়েছে। একসঙ্গে লড়াই করলে ভোট ভাগাভাগি কম হতে পারত। কিন্তু পৃথক প্রার্থী থাকায় একই ভোটব্যাঙ্কের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
তৃণমূলের শক্তি মূলত রাজ্যজুড়ে সংগঠন, প্রশাসনিক প্রভাব এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা। অন্যদিকে কংগ্রেসের ভরসা ঐতিহ্যবাহী সংগঠন, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কিছু নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এই দুই শক্তির মধ্যে বিভাজন হলে বিজেপি বা অন্য কোনও দলও তার সুবিধা পেতে পারে।
## সংখ্যালঘু ভোটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
রেজিনগরে মুসলিম ভোট বরাবরই নির্বাচনের অন্যতম নির্ণায়ক শক্তি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আগের মতো সরল নয়। সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ তৃণমূলের সঙ্গে থাকলেও অন্য অংশ কংগ্রেসের দিকে ফিরতে পারে বলে মনে করছে কংগ্রেস। আবার নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ভূমিকার কারণে ভোটে বিভাজন ঘটার সম্ভাবনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুসলিম ভোটকে একক ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যেও শিক্ষিত তরুণ, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, মহিলা এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের ভোটের অগ্রাধিকার আলাদা হতে পারে। কেউ চাকরি ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিতে পারেন, কেউ স্থানীয় রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানীয় জল বা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। আবার কারও কাছে রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই বহুমাত্রিক ভোটারদের কাছে পৌঁছতেই কংগ্রেস ‘নীরব সমর্থন’-এর উপর জোর দিচ্ছে। প্রকাশ্য সভায় বড় ভিড় না থাকলেও বুথভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে দল।
## বিজেপির উপস্থিতিও উপেক্ষা করার নয়
রেজিনগরে কংগ্রেস ও তৃণমূলের লড়াইয়ের পাশাপাশি বিজেপিও নিজেদের সংগঠন মজবুত করার চেষ্টা করছে। বিজেপি এই আসনে শঙ্খর সরকারকে প্রার্থী করেছে বলে জানা গিয়েছে।
যদিও রেজিনগরে বিজেপির ভোটভিত্তি তৃণমূল বা কংগ্রেসের মতো ঐতিহ্যবাহী নয়, তবুও বিরোধী ভোট ভাগ হলে তাদের লাভ হতে পারে। বিশেষ করে হিন্দু ভোটের একটি অংশ যদি বিজেপির দিকে যায় এবং সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়, তাহলে নির্বাচনী অঙ্কে বিজেপি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসতে পারে।
তবে রেজিনগরের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নন্দীগ্রামের তুলনায় আলাদা। এখানে প্রার্থী, স্থানীয় সংগঠন এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ অনেক সময় দলীয় প্রতীকের থেকেও বেশি প্রভাব ফেলে। তাই কোনও দলই শুধুমাত্র রাজ্যস্তরের জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করে জয় নিশ্চিত করতে পারবে না।
## পুরনো কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্ক ফেরানোর চেষ্টা
রেজিনগর একসময় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১১ সালে কংগ্রেসের হুমায়ুন কবির এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অবস্থান বদল, দলবদল এবং তৃণমূলের উত্থানের ফলে কেন্দ্রটির সমীকরণ পরিবর্তিত হয়েছে।
এবার কংগ্রেস সেই পুরনো সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। দলের স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, শুধু ভোটের সময় প্রচার করলেই হবে না। বুথভিত্তিক সংগঠন, পাড়ায় পাড়ায় যোগাযোগ এবং ভোটারদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শুনতে হবে।
কংগ্রেসের কৌশল হতে পারে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণের পাশাপাশি নিজেদের দলীয় ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা তুলে ধরা। সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ যদি মনে করেন যে তৃণমূলের উপর নির্ভর না করে কংগ্রেসকে শক্তিশালী করা দরকার, তাহলে কংগ্রেস লাভবান হতে পারে।
## ভোটারদের নীরবতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণত সভা, মিছিল, দেওয়াল লিখন এবং প্রচারের মাধ্যমে জনসমর্থনের ছবি তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবে সেই ছবি সবসময় ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয় না। অনেক ভোটার প্রকাশ্যে এক দলের সঙ্গে থাকলেও ভোট দেন অন্য দলকে। রেজিনগরে এই বিষয়টিই কংগ্রেসের প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
তবে ‘নীরব মুসলিম ভোট’ নিয়ে কোনও দলের দাবিকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে দেখা যায় না। ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নির্ভর করবে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, প্রচারের ধরন, স্থানীয় সমস্যা এবং ভোটের দিনের পরিস্থিতির উপর। একইসঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটের মধ্যেও বিভাজন ঘটতে পারে।
কংগ্রেসের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হল—নীরব সমর্থনকে বাস্তব ভোটে পরিণত করা। বুথে কর্মী মোতায়েন, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভোটের দিন সংগঠন সক্রিয় রাখা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
## উপনির্বাচনে বড় পরীক্ষা সব দলের
রেজিনগর উপনির্বাচন শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্রের লড়াই নয়। এই ভোটে তৃণমূল-কংগ্রেস সম্পর্ক, বিজেপির সংগঠন বিস্তার, সংখ্যালঘু ভোটের গতিপ্রকৃতি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব—সবকিছুর পরীক্ষা হবে।
কংগ্রেস যদি রেজিনগরে ভালো ফল করে, তাহলে তা রাজ্যে দলের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে পারে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থানও আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে তারা। অন্যদিকে, তৃণমূল এই আসন ধরে রাখতে পারলে সংখ্যালঘু ভোটের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে, রেজিনগরের ভোটে প্রকাশ্য প্রচারের পাশাপাশি নীরব ভোটারদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কংগ্রেসের আশা, শেষ মুহূর্তে নীরব থাকা সেই ভোটাররাই ব্যালট বা ইভিএমে তাদের পক্ষে মত প্রকাশ করবেন। এখন দেখার, সেই নীরব সমর্থন বাস্তবে কতটা ভোটে রূপান্তরিত হয়।


