আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের বহুল আলোচিত মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI)-র ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাই কোর্ট। তদন্তে অগ্রগতির অভাব এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে খতিয়ে না দেখার অভিযোগ তুলে আদালত সিবিআইকে কার্যত ভর্ৎসনা করে জানিয়েছে, **আগের তদন্তের উপর নির্ভর না করে গোটা মামলাটি নতুন করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।**
বুধবার শুনানির সময় আদালত পর্যবেক্ষণ করে, তদন্তকারী সংস্থা যেন পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজেদের আটকে না রাখে। বরং ঘটনার রাত থেকে শুরু করে মৃত চিকিৎসকের শেষকৃত্য পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাক্রম নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে। আদালতের মতে, তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং কোনও গুরুত্বপূর্ণ দিক যেন বাদ না পড়ে।
এই মামলাটি গোটা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে কর্তব্যরত অবস্থায় এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রথমে কলকাতা পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে কলকাতা হাই কোর্ট মামলার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি নিয়ে শুনানি শুরু করে।
সাম্প্রতিক শুনানিতে আদালত জানতে চায়, এত দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তদন্তে কেন প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, একটি সংবেদনশীল ও বহুল আলোচিত মামলায় তদন্তের গতি এবং নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তদন্তে কোনও ধরনের গাফিলতি বা বিলম্ব গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আদালত সিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছে, তদন্তের সময় পূর্ববর্তী রিপোর্ট বা সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যাবে না। প্রত্যেক সাক্ষ্য, নথি, ফরেনসিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন করে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার শুনানিতে নিহত চিকিৎসকের পরিবারের আইনজীবীরাও তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আসেনি এবং তদন্তে একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনও তদন্তকারী সংস্থাকে পুরনো অনুসন্ধান ভুলে নতুনভাবে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া বিরল ঘটনা। এর অর্থ, আদালত মনে করছে মামলার প্রতিটি দিক নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, যাতে কোনও সম্ভাব্য ত্রুটি বা অপূর্ণতা থেকে না যায়।
আরজি কর কাণ্ডের পর চিকিৎসক সমাজ, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রতিবাদ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটে হাই কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশকে মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এখন আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সিবিআই কীভাবে নতুন করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে। নিহত চিকিৎসকের পরিবারও আশা প্রকাশ করেছে, আদালতের এই কড়া অবস্থানের ফলে তদন্তে নতুন গতি আসবে এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকৃত সত্য সামনে উঠে আসবে।


