পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানাল ব্রিকসের সদস্য দেশগুলি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনওরকম আপস করা হবে না—এই বার্তাই উঠে এসেছে ব্রিকসের যৌথ ঘোষণাপত্রে। সেখানে সন্ত্রাসবাদের সমস্ত রূপ ও প্রকাশের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়। ওই হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বহু মানুষ আহতও হন। পর্যটনকেন্দ্রিক ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের উপর এই হামলা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। হামলার পর থেকেই ভারত আন্তর্জাতিক মহলের কাছে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে আসছে। সেই অবস্থানকেই আরও শক্তিশালী করল ব্রিকসের ঘোষণাপত্র।
## সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের কোনও যুক্তি বা оправনা থাকতে পারে না। হামলার উদ্দেশ্য, স্থান, সংগঠক কিংবা হামলাকারী—যাই হোক না কেন, সন্ত্রাসবাদকে কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দ্বিচারিতারও বিরোধিতা করেছে সদস্য দেশগুলি।
ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সংগঠন এবং তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধেও দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগান, জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া এবং সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের যাতায়াত বন্ধ করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান ভারতের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারত বারবার বলে এসেছে, শুধু হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না। সন্ত্রাসের পিছনে থাকা অর্থের উৎস, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আশ্রয়দাতা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককেও ভেঙে দিতে হবে। ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে সেই বিষয়গুলির উল্লেখ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
## ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে সন্ত্রাসকে যুক্ত নয়
ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি, সভ্যতা বা জাতীয়তার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। সন্ত্রাসবাদ একটি অপরাধ এবং তার দায় অপরাধীদেরই নিতে হবে। কোনও ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।
এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে সামনে রেখে নিজেদের কার্যকলাপকে оправনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলি সেই প্রবণতার বিরুদ্ধেই ঐক্যবদ্ধ বার্তা দিয়েছে।
## রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা জোরদার করার দাবি
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নিয়ে একটি সর্বাঙ্গীন কনভেনশন দ্রুত চূড়ান্ত করে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে ব্রিকস। এই ধরনের আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হলে সন্ত্রাসবাদ, তার অর্থায়ন এবং সীমান্তপারের জঙ্গি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে সদস্য দেশগুলির পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, সহযোগিতা, ঐক্য এবং বহুপাক্ষিকতার নীতির কথাও পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
## ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য?
পহেলগাঁও হামলার নিন্দায় ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির একসঙ্গে সরব হওয়াকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের একাংশ। বিশেষ করে চিন, রাশিয়া-সহ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশগুলির সমর্থন ভারতের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও জোরালো করেছে।
যদিও ঘোষণাপত্রে সরাসরি কোনও দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবু সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় এবং সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও দ্বিচারিতা থাকা উচিত নয়। ব্রিকসের ঘোষণাপত্রেও একই ধরনের অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পহেলগাঁও হামলার নিন্দা জানিয়ে ব্রিকস যে বার্তা দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ, দায়ীদের শাস্তি এবং জঙ্গি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার আহ্বান ভবিষ্যতে সদস্য দেশগুলির পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে।


