পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, রাজ্যে কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু করা হবে। ১৬ আগস্ট ‘আয়ুষ্মান দিবস’ হিসেবে পালন করে এই প্রকল্পকে সামনে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। একই দিনে রাজ্য সরকারের ১০০ দিন পূর্তিও হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচি—দুই বিষয়কে একসঙ্গে সামনে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সরকারি স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে চালুর সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে চালু থাকা স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের পাশাপাশি বা তার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থাকে কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু করা হবে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তখনই বলা হয়েছিল, রাজ্যের বর্তমান স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তাদের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা বা PM-JAY দেশের অন্যতম প্রধান সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যোগ্য পরিবারগুলিকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রকল্পটি চালু হলে রাজ্যের বহু পরিবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমা কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে বাস্তবে কারা কতটা সুবিধা পাবেন, কোন হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা মিলবে এবং পুরনো স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার সম্পর্ক কী হবে—এই বিষয়গুলির বিস্তারিত নির্দেশিকা রাজ্য সরকারের তরফে প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণায় ১৬ আগস্ট তারিখটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর সরকার আগেই জানিয়েছিল, ১৬ আগস্ট থেকে ‘খেলা হবে দিবস’-এর পরিবর্তে ‘আয়ুষ্মান দিবস’ পালন করা হবে। ১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের স্মৃতির সঙ্গে ১৬ আগস্টের ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে বলেও মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। নতুন সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে এই দিনটিকে তাই বিশেষ তাৎপর্য দেওয়া হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের কাছে আয়ুষ্মান ভারত শুধু একটি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প নয়, কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পগুলিকে পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করার বৃহত্তর নীতিরও অংশ। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্যে চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আয়ুষ্মান ভারত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ১৬ আগস্টের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে সরকারের নতুন নীতির বিস্তারিত রূপরেখাও সামনে আসতে পারে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়ে অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকার কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করেনি। রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন সেই নীতিতে বড় পরিবর্তন এনে আয়ুষ্মান ভারত কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আগে থেকেই স্বাস্থ্যসাথীর মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া পরিবারগুলি নতুন ব্যবস্থায় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তাদের নতুন করে আবেদন করতে হবে কি না, পুরনো কার্ড কার্যকর থাকবে কি না—এই বিষয়গুলি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রয়েছে। সরকার যদি স্বাস্থ্যসাথীর উপভোক্তাদের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে একটি বড় সংখ্যক পরিবার সরাসরি নতুন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। মে মাসে সরকারের ঘোষণাতেও বিদ্যমান উপভোক্তাদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছিল।
রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত চালুর ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে প্রকল্পের আওতায় আনা হবে কি না, চিকিৎসার কোন কোন পরিষেবা ক্যাশলেস পদ্ধতিতে পাওয়া যাবে এবং হাসপাতালগুলিকে কীভাবে অর্থ প্রদান করা হবে—এসব বিষয়ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে হলে হাসপাতালগুলির তালিকা এবং অনুমোদিত চিকিৎসা পরিষেবা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের পাশাপাশি সরকারের সামনে রয়েছে চিকিৎসা পরিকাঠামো উন্নয়নের চ্যালেঞ্জও। বিমার সুবিধা থাকলেও পর্যাপ্ত হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ এবং আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামো না থাকলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আয়ুষ্মান ভারত চালুর সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
১৬ আগস্টের কর্মসূচিকে রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ওই দিনই নতুন সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হবে। ফলে আয়ুষ্মান ভারত চালু করার ঘোষণাকে সরকার তার প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরতে পারে। একইসঙ্গে আগের সরকারের স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার পার্থক্যও রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম বিষয় হতে পারে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ রাখা। কার্ড তৈরি, যোগ্যতা যাচাই, হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসার অনুমোদন এবং চিকিৎসার পর অর্থ মেটানোর মতো ধাপগুলি যত সহজ হবে, প্রকল্প তত বেশি কার্যকর হবে। গ্রামাঞ্চলের মানুষ যাতে প্রকল্প সম্পর্কে সহজে তথ্য পান এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা পেতে গিয়ে কোনও প্রশাসনিক সমস্যায় না পড়েন, সেটিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্যে চালুর ফলে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় জাতীয় স্তরের একটি কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি হতে পারে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে সমন্বয় বাড়লে হাসপাতাল, চিকিৎসা পরিষেবা এবং স্বাস্থ্যবিমার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে প্রশাসনিক বাস্তবায়ন এবং উপভোক্তাদের প্রকৃত সুবিধা পাওয়ার উপর।
সব মিলিয়ে ১৬ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে চলেছে। ‘আয়ুষ্মান দিবস’ পালনের মাধ্যমে রাজ্যে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের নতুন অধ্যায় শুরু করার পরিকল্পনা করেছে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। মে মাসে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জুলাই থেকে প্রকল্প চালুর প্রাথমিক ঘোষণা হয়েছিল; এখন ১৬ আগস্টকে কেন্দ্র করে এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, নতুন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থায় চিকিৎসার খরচ কমবে এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলি উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবে। সরকার কীভাবে স্বাস্থ্যসাথী উপভোক্তাদের নতুন ব্যবস্থায় যুক্ত করে, কোন হাসপাতালগুলি প্রকল্পের আওতায় আসে এবং সুবিধা পাওয়ার নিয়ম কী হয়—এই প্রশ্নগুলির উত্তর ১৬ আগস্টের ঘোষণায় আরও স্পষ্ট হতে পারে। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ‘আয়ুষ্মান দিবস’ ঘিরে এখন রাজ্যের স্বাস্থ্য মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।


