মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল অন্তত ৫ জনের। রবিবার অবতরণের সময় অ্যামাজনের একটি কার্গো বিমান রানওয়ে ছাড়িয়ে গিয়ে একাধিক গাড়িতে ধাক্কা মারে। এরপরই বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। ঘটনায় আরও ৫ জন আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে স্থানীয় সময় রবিবার দুপুর প্রায় ২টো নাগাদ। **21 Air** পরিচালিত **Amazon Air Flight 7598** বিমানটি পুয়ের্তো রিকোর সান জুয়ান থেকে মায়ামির উদ্দেশে উড়েছিল। অবতরণের সময় কোনও কারণে বিমানটি নির্ধারিত রানওয়ের মধ্যে থামতে পারেনি। রানওয়ে পেরিয়ে বিমানটি বিমানবন্দরের বাইরের এলাকায় চলে যায় এবং একাধিক গাড়িতে ধাক্কা মারে।
### Boeing 767-300 কার্গো বিমানে আগুন
দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি ছিল **Boeing 767-300** মডেলের একটি কার্গো বিমান। রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বিমানটি বেশ কয়েকটি গাড়িকে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর বিমানের শরীরে আগুন ধরে যায় এবং ঘটনাস্থল কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া ভিডিওতেও দুর্ঘটনার পর ব্যাপক ধোঁয়া ও আগুনের ছবি দেখা গিয়েছে।
মায়ামি-ডেড কাউন্টির মেয়র ড্যানিয়েলা লেভিন কাভা জানান, দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
### উদ্ধারকাজে ২০০-র বেশি জরুরি কর্মী
বিমান দুর্ঘটনার খবর পেয়েই মায়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ-এর বিশাল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। ৬০টিরও বেশি জরুরি পরিষেবা ইউনিট এবং প্রায় ২০০ জন কর্মী উদ্ধার ও আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেন। বিমানটিতে আটকে পড়া পাইলট ও কো-পাইলটকে উদ্ধারের পাশাপাশি মাটিতে থাকা গাড়িগুলির মধ্যে আটকে পড়া ব্যক্তিদেরও বের করে আনার চেষ্টা করা হয়।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, দুর্ঘটনার পর বিমানটির ককপিটে পাইলট ও কো-পাইলট আটকে ছিলেন। পাশাপাশি একটি গাড়ির নিচে একজন আটকে পড়েছিলেন। উদ্ধারকারীরা বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাঁদের উদ্ধারের কাজ চালান। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
### কেন রানওয়ে ছাড়িয়ে গেল বিমান?
এই মুহূর্তে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ নিশ্চিত নয়। মার্কিন **National Transportation Safety Board (NTSB)** তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জেনিফার হোমেন্ডির নেতৃত্বে তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে **Federal Aviation Administration (FAA)**-ও দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে।
তদন্তকারীরা বিমানটি রানওয়ের ঠিক কোন জায়গায় মাটি ছুঁয়েছিল, অবতরণের সময় গতি কত ছিল এবং আবহাওয়া ও বাতাসের পরিস্থিতি কেমন ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন। বিমানটি রানওয়ের অনেকটা ভিতরে অবতরণ করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয়। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি।
### মায়ামি বিমানবন্দরে বিমান চলাচলে বড় প্রভাব
দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাত্রীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়, বিমানবন্দরে বড় ধরনের বিলম্ব এবং বিমান বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্ঘটনার প্রভাব পড়ে শতাধিক ফ্লাইটে। পরে বিমানবন্দরের কয়েকটি রানওয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে পরিষেবা ফের শুরু করা হয়।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কারণে ১৬০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল এবং ৩২৫টির মতো ফ্লাইটে বিলম্ব হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে শুধু দুর্ঘটনাস্থলেই নয়, গোটা বিমানবন্দরেই ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
### অ্যামাজনের তরফে শোকপ্রকাশ
ঘটনার পর অ্যামাজনের তরফে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিমানটি অবতরণের সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হচ্ছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থা।
বিমানটি অ্যামাজনের কার্গো পরিষেবায় ব্যবহৃত হলেও এটি পরিচালনা করছিল **21 Air**। দুর্ঘটনার পর বিমান সংস্থা এবং অ্যামাজন—দুই পক্ষই তদন্তে সহযোগিতা করছে।
### ফের প্রশ্নের মুখে কার্গো বিমানের নিরাপত্তা
এই দুর্ঘটনা ফের কার্গো বিমানের নিরাপত্তা এবং রানওয়ে ওভাররান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর আগে বিভিন্ন বিমানবন্দরেও অবতরণের সময় কার্গো বিমান রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে মায়ামির ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি মাটিতে থাকা গাড়িগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তদন্তকারীরা এখন বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণ, অবতরণের প্রক্রিয়া, আবহাওয়া, রানওয়ের অবস্থা এবং বিমানচালকদের সিদ্ধান্ত—সবকিছু খতিয়ে দেখবেন। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই বোঝা যাবে, ঠিক কী কারণে বিমানটি রানওয়ে ছাড়িয়ে এত দূর চলে গেল।
এই মুহূর্তে মায়ামি প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হল দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আহতদের চিকিৎসা এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক পরিষেবা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে নিহতদের পরিচয় এবং দুর্ঘটনার পরিস্থিতি নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে প্রশাসন।


