নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এবার সেই বিতর্কে সরাসরি অনন্ত মহারাজকে কটাক্ষ করলেন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত স্বামী প্রদীপ্তানন্দজি মহারাজ, যিনি কার্তিক মহারাজ নামে পরিচিত। শুক্রবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নেতাজির মতো মহান ব্যক্তিত্বের সমালোচনা করার মতো যোগ্যতা কারও নেই। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে নেতাজির আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকার কথাও।
সোনারপুরে আর্য সমাজের উদ্যোগে অখণ্ড ভারত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিশেষ যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন কার্তিক মহারাজ। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে অনন্ত মহারাজের সাম্প্রতিক মন্তব্য প্রসঙ্গ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কার্তিক মহারাজ কার্যত তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “কে অনন্ত মহারাজ?” একইসঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, নেতাজির নখের যোগ্যও আমরা নই।
কার্তিক মহারাজের বক্তব্যের মূল সুর ছিল নেতাজির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সামনে আনা। তিনি বলেন, নেতাজির জীবন ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত এবং সংগ্রামমুখর। তাঁর তপস্যা, সাধনা এবং আত্মত্যাগ সম্পর্কে যথেষ্ট না জেনে তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির অবদানকে স্মরণ করে তিনি জানান, তাঁর আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিশেষভাবে নেতাজির এলগিন রোডের বাড়ি থেকে গোপনে বেরিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন কার্তিক মহারাজ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নেতাজি নিজের ব্যক্তিগত জীবন, আরাম এবং নিরাপত্তা ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার কথাও উল্লেখ করেন কার্তিক মহারাজ। নেতাজির মা চণ্ডীর মূর্তি এবং তাঁর জপের মালার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চান, স্বাধীনতার সংগ্রামের পাশাপাশি নেতাজির ব্যক্তিত্বের অন্য দিকগুলিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই মন্তব্যের সূত্রপাত অবশ্য অনন্ত মহারাজের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজ নেতাজি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। তিনি দাবি করেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসকে শুধুমাত্র মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু বা কংগ্রেসের আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। একইসঙ্গে কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি নেতাজির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশকে নেতাজির প্রতি অবমাননাকর হিসেবে দেখা হয়।
অনন্ত মহারাজের এই মন্তব্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়। শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শিবির নয়, বিজেপির অন্দরেও বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও অনন্ত মহারাজের মন্তব্যকে ‘ক্ষমার অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে অনন্ত মহারাজ পরে প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করায় তাঁর বয়স ও প্রবীণ নাগরিক হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে সেই ক্ষমাপ্রার্থনাকে ইতিবাচক দিক হিসেবেও দেখার কথা বলেন শুভেন্দু।
বিতর্কের মধ্যেই অনন্ত মহারাজ একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে দুঃখপ্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জানান, নেতাজি সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্যের কারণে কেউ মানসিকভাবে আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। ভবিষ্যতে মন্তব্য করার সময় আরও সতর্ক থাকার কথাও জানান তিনি। তবে তাঁর এই ক্ষমাপ্রার্থনার পরেও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। ইতিমধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের হওয়ার খবর সামনে এসেছে।
শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, আইন আইনের পথে চলবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় একাধিক এফআইআর হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আপত্তিকর পোস্টের বিরুদ্ধেও পুলিশ পদক্ষেপ করেছে। সরকারি পদক্ষেপের মধ্যে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট মুছে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার কথাও জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নেতাজি সম্পর্কে মন্তব্যের জেরে অনন্ত মহারাজকে দেওয়া ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহার করেছে রাজ্য সরকার। সম্মান প্রত্যাহারের পরই অনন্ত মহারাজের দুঃখপ্রকাশ রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও তীব্র করে তোলে। বিষয়টি এখন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মন্তব্যের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে নেতাজির ঐতিহাসিক মর্যাদা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক।
কার্তিক মহারাজ অবশ্য তাঁর বক্তব্যে শুধু অনন্ত মহারাজের সমালোচনা করেই থেমে থাকেননি। তিনি অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তাঁর দাবি, কংগ্রেসের সময় নেতাজিকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং বামফ্রন্টের আমলেও নেতাজিকে নিয়ে অসম্মানজনক বক্তব্য ও রাজনৈতিক বিরোধিতা হয়েছিল। তাই বর্তমানে যাঁরা নেতাজি সম্পর্কে মন্তব্য করছেন, তাঁদের আগে তাঁর সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা উচিত বলেই মত কার্তিক মহারাজের।
অন্যদিকে, মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ তুলনামূলকভাবে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কেউ ভুল স্বীকার করলে এবং ক্ষমা চাইলে সমাজেরও উদার হওয়া উচিত। সংবেদনশীল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এমন কোনও মন্তব্য করা উচিত নয়, যার ফলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, ভুল স্বীকার এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকে সম্মান করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে বাংলায়। একদিকে অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত মন্তব্য, অন্যদিকে তাঁর পরবর্তী দুঃখপ্রকাশ এবং সরকারি পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু। তার মধ্যেই কার্তিক মহারাজের “নেতাজির নখের যোগ্য আমরা নই” মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর “কে অনন্ত মহারাজ?” কটাক্ষও রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাঙালির আবেগ এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তাই তাঁকে নিয়ে কোনও মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলে তার প্রতিক্রিয়া যে সাধারণ রাজনৈতিক বিতর্কের তুলনায় অনেক বেশি হবে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহই তার প্রমাণ। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে এই বিতর্ক আবারও মনে করিয়ে দিল, নেতাজির ইতিহাস এবং তাঁর আত্মত্যাগ আজও বাংলার মানুষের কাছে কতটা আবেগ ও শ্রদ্ধার বিষয়।


