স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দেশভাগের ভয়াবহ স্মৃতি উসকে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানুষের বাস্তুচ্যুতি, হিংসা, মৃত্যু এবং স্বজন হারানোর বেদনা। সেই ইতিহাসকে স্মরণ করেই ‘Partition Horrors Remembrance Day’-এর আবহে দেশভাগের প্রসঙ্গ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর মতো রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের কথাও।
স্বাধীনতার ৭৯ বছর পূর্তির আগে গোটা দেশ যখন জাতীয় পতাকা, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং দেশের গৌরবময় ইতিহাস স্মরণ করছে, ঠিক সেই সময় দেশভাগের অন্ধকার অধ্যায়ও সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৩ ও ১৪ আগস্ট ‘Partition Horrors Remembrance Day’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং যাঁরা সেই সময়ের হিংসার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন, তাঁদের স্মৃতিকে সম্মান জানানোই এই পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই আবহেই সুভেন্দু অধিকারী দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে সরব হন। তাঁর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কলকাতার ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক হিংসার স্মৃতি। ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত সেই ঘটনা বাংলার ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। দেশভাগের ঠিক আগের সময়ে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল। বহু মানুষ প্রাণ হারান, বহু পরিবার সর্বস্ব হারায়। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস পরবর্তীকালে দেশভাগের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই শুধুমাত্র স্বাধীনতার আনন্দ নয়, স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বেদনার কথাও সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথে যে অসংখ্য মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল, তাঁদের আত্মত্যাগ ও দুর্ভোগও ভুলে গেলে চলবে না। দেশভাগের ক্ষত আজও বাংলার বহু পরিবারের স্মৃতিতে জীবন্ত।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দেশভাগের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় নেন। তাঁদের অনেকেই রাতারাতি ঘরবাড়ি, জমিজমা, ব্যবসা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক হারিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হন। শরণার্থী কলোনির ইতিহাস, উদ্বাস্তুদের সংগ্রাম এবং নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
দেশভাগের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলা ভাগ নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। একদিকে ছিল অখণ্ড বাংলার ধারণা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে দেশভাগের দাবি ক্রমশ জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাগ হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য সেই ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়াস হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছে দেশভাগ আজ শুধুই ইতিহাসের বইয়ের একটি অধ্যায়। কিন্তু সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রভাব বহু পরিবার এখনও বহন করে চলেছে। ফলে দেশভাগের ইতিহাস স্মরণ করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সেই সময়ের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করার বার্তাও সামনে আসে।
এদিকে স্বাধীনতা দিবসের আগে পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের স্মরণ ঘিরে একাধিক কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও ১৪ আগস্ট ‘Partition Horrors Remembrance Day’ পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য দেশভাগের সময়কার মানবিক বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি ও হিংসার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে তাই একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতার গৌরব এবং দেশের অগ্রগতির কথা সামনে আসছে, অন্যদিকে উঠে আসছে ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ও। সুভেন্দু অধিকারীর ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ভুলব কী করে?’ মন্তব্য সেই বিতর্ককেই আরও জোরালো করেছে। স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি দেশভাগের ক্ষত, নিহত ও উদ্বাস্তু মানুষের স্মৃতি এবং সেই সময়ের সামাজিক বিপর্যয়কে মনে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইতিহাসের সেই অধ্যায় বহু দশক পেরিয়েও পুরোপুরি মুছে যায়নি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশভাগের স্মৃতি পরিবারগুলির কথায়, নথিতে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বেঁচে রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের আগে সেই স্মৃতিকে সামনে এনে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য আবারও মনে করিয়ে দিল—স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন গর্বের, তেমনই তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর বেদনার ইতিহাসও।


