পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তি কোনও ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত (Accused) হলেই তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা যায় না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বা উপযুক্ত কারণ দেখানো ছাড়া কোনও আবেদনকারীর পাসপোর্ট আবেদন বাতিল বা আটকে রাখা যাবে না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মামলায় আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকায় পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল, শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তি অভিযুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর বিদেশ ভ্রমণের অধিকার বা পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার সীমাবদ্ধ করা যায় কি না।
শুনানির সময় আদালত জানায়, ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশ ভ্রমণের অধিকারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। তাই কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন থাকলেই তাঁর পাসপোর্টের আবেদন সরাসরি খারিজ করা যাবে না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই **Passports Act, 1967**-এর বিধান মেনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ কারণও জানাতে হবে।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে, কোনও ব্যক্তি অভিযুক্ত মানেই তিনি অপরাধী নন। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইন অনুযায়ী প্রত্যেক অভিযুক্ত নির্দোষ বলে গণ্য হন। সেই কারণেই শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও নাগরিকের মৌলিক অধিকার সীমিত করা উচিত নয়। যদি তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থে কোনও বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন হয়, তবে তা অবশ্যই আইনি বিধান অনুসারে এবং যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে পাসপোর্ট সংক্রান্ত একাধিক মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনও ফৌজদারি মামলার অভিযুক্ত হওয়ার কারণে আবেদনকারীদের পাসপোর্ট ইস্যু বা নবীকরণে অযথা বিলম্ব হয়। আদালতের এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে এবং শুধুমাত্র বিচারাধীন মামলার অজুহাতে আবেদন আটকে রাখা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাসপোর্ট প্রদান বা নবীকরণের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট মামলার প্রকৃতি, আদালতের নির্দেশ এবং পাসপোর্ট আইনের বিধানের উপর। তবে কোনও সাধারণ নিয়ম হিসেবে অভিযুক্তদের অধিকার খর্ব করা যাবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই রায়ের ফলে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তাঁদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। একই সঙ্গে আদালত প্রশাসনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণ এবং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখা—দুই ক্ষেত্রেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
কলকাতা হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ আবারও মনে করিয়ে দিল, বিচারাধীন থাকা এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়া—এই দুই বিষয় এক নয়। তাই কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকলেই তাঁর পাসপোর্টের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। আইনসম্মত প্রক্রিয়া, যুক্তিসঙ্গত কারণ এবং প্রয়োজনীয় বিচারিক নির্দেশের ভিত্তিতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


