প্রায় ছয় বছরের দীর্ঘ বিরতির পর ফের চালু হল ভারত ও চিনের সীমান্ত বাণিজ্য। কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক রুটগুলি আবার খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সিকিমের নাথু লা (Nathu La), হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা (Shipki La) এবং উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ (Lipulekh) হয়ে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ভারত-চিন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। দুই দেশের প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সীমান্তে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়। বহু বছর পর ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আবার নির্ধারিত নিয়ম মেনে সীমান্ত পেরিয়ে তিব্বতের বাজারে পণ্য নিয়ে যেতে শুরু করেছেন। একইভাবে চিনের ব্যবসায়ীরাও সীমান্ত বাণিজ্যে অংশ নিচ্ছেন।
সিকিমের নাথু লা পাস ঐতিহাসিক ‘সিল্ক রুট’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০০৬ সালে দীর্ঘ বিরতির পর এই পথ বাণিজ্যের জন্য খুলেছিল। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারি এবং ভারত-চিন সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ছয় বছর পর ফের এই পথ চালু হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে।
হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার শিপকি লা দিয়েও বাণিজ্য শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সীমিত সংখ্যক ভারতীয় ব্যবসায়ীকে তিব্বতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে আরও ব্যবসায়ীদের অনুমতি দেওয়া হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। এই রুটটি দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী এলাকার স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম ভরসা।
উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস দিয়েও ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হয়েছে। এই পথটি শুধু বাণিজ্যের জন্য নয়, কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে এই যাত্রাও ধাপে ধাপে পুনরায় শুরু হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রশাসনের মতে, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি আসবে। বিশেষ করে সিকিম, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের শত শত নিবন্ধিত ব্যবসায়ী সরাসরি উপকৃত হবেন। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল বহু পরিবার আবারও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পাবে।
সীমান্ত বাণিজ্যে মূলত নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত পণ্যের আদান-প্রদান করা হয়। ভারত থেকে খাদ্যপণ্য, মশলা, বস্ত্র, কৃষিজ পণ্য এবং কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী রপ্তানি করা হয়। অন্যদিকে তিব্বত থেকে উল, পশম, কাঁচা রেশম, পশুপণ্য এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ভারতে আসে। এই বাণিজ্য মূলত সীমান্তবর্তী এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়া শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক বছরে সীমান্ত উত্তেজনার কারণে ভারত-চিন সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা এবং সীমান্ত যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হলেও এটি এখনও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে। নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যবসায়ী, নির্দিষ্ট পণ্য এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই বাণিজ্য চলবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা এবং কাস্টমস সংক্রান্ত সমস্ত নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়া নিঃসন্দেহে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। আগামী দিনে এই বাণিজ্যের পরিধি আরও বাড়ানো হয় কি না এবং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহল ও সীমান্ত অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের।


