আর মাত্র কয়েক মাসের অপেক্ষা। তারপরই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব **দুর্গাপুজো**। সেই উৎসবকে ঘিরে ইতিমধ্যেই কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন পুজো কমিটির প্রস্তুতি জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। শহরের অধিকাংশ বড় ও ঐতিহ্যবাহী পুজো কমিটি ইতিমধ্যেই **খুঁটি পুজো (Khuti Puja)** সম্পন্ন করেছে। এই শুভ আচার শেষ হওয়ার পর থেকেই মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা তৈরির কাজ, আলোকসজ্জা এবং থিম বাস্তবায়নের কাজ পূর্ণ গতিতে এগিয়ে চলেছে।
খুঁটি পুজো দুর্গাপুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুজো মণ্ডপ তৈরির প্রথম বাঁশ বা খুঁটি পুজো করে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। প্রতিবছরের মতো এ বছরও কলকাতার একাধিক বিখ্যাত পুজো কমিটি ধুমধাম করে এই আচার সম্পন্ন করেছে। পুজো উদ্যোক্তাদের মতে, খুঁটি পুজো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন কার্যত শুরু হয়ে যায়।
শহরের **মোহাম্মদ আলি পার্ক**, **শ্রীভূমি**, **চোরবাগান**, **সুরুচি সংঘ**, **বাগবাজার**, **চেতলা অগ্রণী**, **ত্রিধারা সম্মিলনী**-সহ একাধিক বড় পুজো কমিটি ইতিমধ্যেই তাদের খুঁটি পুজো সম্পন্ন করেছে। অনেক কমিটি এবারের থিম সম্পর্কেও প্রাথমিক ঘোষণা করেছে। কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও ভারতীয় সংস্কৃতি, আবার কোথাও পরিবেশ সংরক্ষণ বা সামাজিক বার্তার উপর ভিত্তি করে থিম গড়ে তোলা হচ্ছে।
পুজো উদ্যোক্তাদের দাবি, এবার দর্শনার্থীদের জন্য আরও উন্নত অভিজ্ঞতা তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা, অগ্নি-নিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কলকাতা পুলিশ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিরাপত্তা পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে কুমোরটুলিতেও ব্যস্ততা তুঙ্গে। খুঁটি পুজো শেষ হওয়ার পর প্রতিমা শিল্পীরা দিনরাত এক করে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মাটির কাজ, রং, অলংকরণ এবং শেষ মুহূর্তের শিল্পকর্ম নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর প্রস্তুতি চলছে। শিল্পীদের আশা, এবার দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী কলকাতার দুর্গাপুজো দেখতে আসবেন।
শহরের বিভিন্ন পুজো কমিটির বাজেটও ধীরে ধীরে চূড়ান্ত হচ্ছে। বড় বাজেটের পুজোগুলিতে থিম, আলোকসজ্জা, শিল্পকলা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুনত্ব আনার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি বাজেটের পুজোগুলিও নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে দর্শকদের আকর্ষণ করার পরিকল্পনা করছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। **ইউনেস্কোর Intangible Cultural Heritage** স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহও আরও বেড়েছে। ফলে হোটেল, পরিবহণ, রেস্তোরাঁ, খুচরো ব্যবসা এবং পর্যটন শিল্পও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বড় অর্থনৈতিক গতি পায়।
তবে এ বছর কয়েকটি পুজো কমিটিতে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক পরিবর্তনের ঘটনাও সামনে এসেছে। কোথাও নতুন পরিচালন কমিটি দায়িত্ব নিয়েছে, কোথাও আবার অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে পৃথকভাবে খুঁটি পুজো হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবুও অধিকাংশ পুজো কমিটির দাবি, সব বিতর্ক দূরে রেখে উৎসব সফল করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
এবারের দুর্গাপুজোর আরেকটি বিশেষ দিক হল পঞ্জিকা অনুযায়ী **’ডাবল সপ্তমী’**। এর ফলে উৎসবের সূচিতে কিছু পরিবর্তন আসছে এবং বিভিন্ন পুজো কমিটি সেই অনুযায়ী অনুষ্ঠানসূচি ও আয়োজন সাজাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, অতিরিক্ত একটি উৎসবের দিন দর্শনার্থীদের জন্য আরও বড় আকর্ষণ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে, **কলকাতার অধিকাংশ দুর্গাপুজো কমিটির খুঁটি পুজো সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৬ সালের শারদোৎসবের প্রস্তুতি এখন পূর্ণোদ্যমে শুরু হয়েছে।** থিম, শিল্প, ঐতিহ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে এবারও কলকাতার দুর্গাপুজো দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের জন্য অন্যতম বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলেই আশাবাদী পুজো উদ্যোক্তারা।


