কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation বা KMC) এলাকায় হঠাৎ করে **মৃত্যুর শংসাপত্র (Death Certificate)** এবং দাহ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ইস্যু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সমস্যায় পড়েছেন শতাধিক পরিবার। গত **২৫ জুলাই** থেকে কেএমসি পরিচালিত শ্মশান ও কবরস্থানগুলিতে এই পরিষেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা উত্তরাধিকার, বিমা দাবি, পেনশন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা, সম্পত্তি হস্তান্তর-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন না।
সূত্রের খবর, সম্প্রতি **জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যু সংক্রান্ত তদন্ত** শুরু হওয়ার পর মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে এই পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রারদের নতুন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত মৃত্যু-সংক্রান্ত শংসাপত্র ইস্যু না করার কথা জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে কলকাতা পুরসভার তরফে প্রথমদিকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সেই পরিবারগুলির উপর, যারা কলকাতার বাইরে অন্য জেলা থেকে আত্মীয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে কেএমসি এলাকার শ্মশানে এসেছিলেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দাহ বা দাফনের পর যে শংসাপত্র দেওয়া হয়, সেটিই পরবর্তীতে সরকারি **Death Certificate** পাওয়ার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। কিন্তু সেই নথি না পাওয়ায় পরবর্তী পুরো আইনি প্রক্রিয়াই আটকে যাচ্ছে।
জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিনে **এক হাজারেরও বেশি দাহ ও দাফন সম্পন্ন হলেও** সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির হাতে সরকারি শংসাপত্র তুলে দেওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির চিকিৎসকের দেওয়া মেডিক্যাল ডেথ সার্টিফিকেট এবং আধার কার্ড জমা নেওয়ার পর শুধুমাত্র অর্থ জমা দেওয়ার একটি রসিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই রসিদের কোনও আইনি বৈধতা না থাকায় তা সরকারি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যু শংসাপত্র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। এটি ছাড়া উত্তরাধিকার সনদ, জীবনবিমার দাবি, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট বন্ধ, পেনশন স্থানান্তর, সম্পত্তির মিউটেশন কিংবা বিভিন্ন সরকারি সুবিধার আবেদন করা সম্ভব হয় না। ফলে কয়েক দিনের এই পরিষেবা বন্ধ থাকলেও বহু পরিবারকে জটিল প্রশাসনিক সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এদিকে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই সমস্যা কাটাতে কেএমসি পরবর্তীতে **১৬টি বরো স্তরের আধিকারিককে রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে**, যাতে মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যুর প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ করা যায় এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত পরিষেবা পান। প্রশাসনের আশা, এই পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং জট অনেকটাই কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল পরিষেবা চালুর ফলে নাগরিক পরিষেবা দ্রুত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোনও তদন্ত, প্রযুক্তিগত সমস্যা বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের উপর পড়ে। তাই জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রের মতো অত্যাবশ্যক পরিষেবায় বিকল্প ব্যবস্থা (backup mechanism) থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে নাগরিক সংগঠনগুলির দাবি, তদন্ত চললেও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ না রেখে বিকল্প পদ্ধতিতে চালু রাখা উচিত ছিল। এতে তদন্তের কাজও চলত এবং সাধারণ মানুষও ভোগান্তির শিকার হতেন না।
কেএমসি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ এবং পরিষেবা পুনরায় সচল করার উদ্যোগের ফলে অচিরেই সমস্যা কাটতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে যাঁদের জরুরি ভিত্তিতে মৃত্যু শংসাপত্র প্রয়োজন, তাঁদের এখনও কিছুটা অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, **কলকাতা পুরসভায় মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা** নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্তের স্বার্থে নেওয়া পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যাতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি না করে, সেদিকেই এখন নজর প্রশাসন ও নাগরিকদের।


