ভাগ্যের এক ছোট্ট পরিবর্তন কখনও কখনও মানুষের জীবন-মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান এবং আকস্মিক বন্যার মাঝে ঠিক তেমনই এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন পূর্ব বর্ধমানের দুই পর্যটক। মাত্র ১৫ মিনিটের একটি চা-বিরতিই তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি তাঁরা সেই সময় গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যেতেন, তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারতেন তাঁরা। কিন্তু রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। নেপাল থেকে নিরাপদে বাড়ি ফিরে এখনও সেই ভয়াবহ মুহূর্তের কথা ভুলতে পারছেন না বর্ধমানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কল্যাণকুমার তা।
বর্ধমানের বিধানপল্লির বাসিন্দা কল্যাণকুমার তা পেশায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে নেপাল পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পূর্ব বর্ধমানেরই বাসিন্দা বিপ্লব হাজরা। গত ২১ আগস্ট তাঁরা যাত্রা শুরু করেন। পরদিন অর্থাৎ ২২ আগস্ট তাঁরা পৌঁছন নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে। সেখান থেকে তাঁদের পরিকল্পনা ছিল চিন সীমান্ত পেরিয়ে মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবহাওয়া এবং ভিসা সংক্রান্ত সমস্যার কারণে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়।
কাঠমাণ্ডু পৌঁছনোর পর থেকেই তাঁদের যাত্রাপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ২৩ এবং ২৪ আগস্ট অপেক্ষা করেও তাঁরা প্রয়োজনীয় ভিসা হাতে পাননি। শেষ পর্যন্ত ২৫ আগস্ট রাতে তাঁদের হাতে ভিসা আসে। পরিকল্পনা ছিল সেদিন রাতেই মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার। রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু প্রবল বৃষ্টির কারণে রাতের যাত্রা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবর্তে ঠিক করা হয়, ভোরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গাড়ি নিয়ে রওনা দেবেন তাঁরা। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে তাঁদের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
২৬ আগস্ট ভোরে অবশেষে গাড়ি নিয়ে চিন সীমান্তের দিকে রওনা হন কল্যাণবাবু, বিপ্লববাবু এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা অন্য পর্যটকেরা। তাঁদের গন্তব্য ছিল প্রায় ১২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিন সীমান্ত। শুরুতে যাত্রা স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে গাড়িতে চলার কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েন পর্যটকেরা। ফলে রসুই এলাকার কিছুটা আগে বিদুরের কাছে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানেই তাঁরা চা খেতে বসেন। এই সামান্য বিরতিই তাঁদের ভাগ্য বদলে দেয়।
কল্যাণকুমারের কথায়, তাঁরা এক কাপ চা খেয়ে আবার গাড়িতে উঠে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় পুলিশ তাঁদের পথ আটকে দেয়। তাঁদের আর সামনে যেতে দেওয়া হয়নি। প্রথমে হয়তো এই বাধাকে সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাঁরা বুঝতে পারেন, সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। যে রাস্তা দিয়ে তাঁদের কয়েক মিনিটের মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই এলাকাতেই ততক্ষণে হড়পা বান ভয়ঙ্কর তাণ্ডব শুরু করেছে। ফলে সামান্য সময়ের ব্যবধানেই তাঁরা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পান।
প্রকৃতির সেই ভয়াবহ রূপ নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে কল্যাণকুমারকে। সমতলের বাসিন্দা হিসেবে পাহাড়ি হড়পা বান সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে তিনি এতদিন মূলত টেলিভিশনের খবরেই দেখেছেন। কিন্তু নেপালের সেই ঘটনা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর বর্ণনায়, আচমকাই প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে পাহাড়ের উপর থেকে সাদা মেঘের মতো জলরাশি নেমে আসতে দেখা যায়। সেই জলের সঙ্গে ছিল পাথর, কাদা এবং বালি। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় গোটা পরিবেশ।
সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য ছিল একটি সেতুকে ঘিরে। কল্যাণকুমারের চোখের সামনে গাড়ি, মানুষ, কুকুর এবং গবাদি পশু-সহ একটি সেতু ভেসে যেতে দেখেন তিনি। প্রবল জলস্রোতের সামনে কার্যত কিছুই দাঁড়াতে পারেনি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেই সেতু এবং তার উপর থাকা সবকিছু হড়পা বানের স্রোতে তলিয়ে যায়। চারপাশে তখন শুধু জল, কাদা, পাথর এবং ধ্বংসস্তূপ। প্রকৃতির সেই তাণ্ডব এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ঘটনাটি এখনও তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে রয়েছে।
কল্যাণকুমার জানিয়েছেন, প্রকৃতির সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য কোনও ক্যামেরায় পুরোপুরি ধরা সম্ভব নয়। মানুষের চোখের সামনে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে ভিডিও ফুটেজের তুলনা হয় না। তিনি নিজে বেঁচে ফিরলেও সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। বাড়ি ফেরার পরও মোবাইলে নেপালের ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও দেখতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। নিজের চোখে দেখা সেই বিপর্যয়ের সঙ্গে পরবর্তীতে পাওয়া ছবিগুলি মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন তিনি।
তবে এই অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও একটি বড় শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন বর্ধমানের এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর মতে, প্রকৃতির উপর মানুষের অত্যাচারের ফল একদিন না একদিন ফিরে আসবেই। পাহাড় কাটা, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা, নির্বিচারে নির্মাণ এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথে হস্তক্ষেপের মতো বিষয়গুলি নিয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে তিনি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন না; এর মধ্যে মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তাও দেখতে পাচ্ছেন।
তাঁর বক্তব্যে আতঙ্কের পাশাপাশি আক্ষেপও রয়েছে। তিনি মনে করছেন, প্রকৃতি যখন তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারায়, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, নেপালের ঘটনা তার বাস্তব উদাহরণ। তাঁর নিজের কথাতেই, প্রকৃতির এই রূপ না দেখলেই হয়তো ভালো হত। কিন্তু একবার সেই ভয়াবহতা চোখের সামনে দেখার পর বিষয়টি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশের ভূমিকা। কল্যাণকুমারদের গাড়ি পুলিশ আটকে না দিলে তাঁরা হয়তো বিপর্যয়ের কেন্দ্রের আরও কাছে চলে যেতেন। ফলে তাঁদের নিরাপদে থাকা অনেকটাই নির্ভর করেছিল সেই মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তের উপর। পর্যটকদের ক্ষেত্রে পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের সময় স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনাও তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
বিশেষ করে বর্ষাকালে নেপাল, উত্তর ভারত এবং হিমালয় সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং স্থানীয় সতর্কবার্তা মেনে চলা জরুরি। পাহাড়ি অঞ্চলে আবহাওয়া খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কোনও এলাকায় বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই পাহাড়ি নদী বা ঝোরার জলস্তর দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। আবার দূরের এলাকায় ভারী বৃষ্টির প্রভাবেও হঠাৎ করে হড়পা বান নেমে আসতে পারে। ফলে রাস্তা ফাঁকা দেখালেও সেটিকে সবসময় নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না।
কল্যাণকুমার এবং বিপ্লব হাজরার ঘটনাটি সেই ঝুঁকিরই একটি বাস্তব উদাহরণ। তাঁদের যাত্রাপথের সামান্য পরিবর্তন এবং একটি ছোট্ট বিরতি তাঁদের ভয়াবহ বিপর্যয়ের সামনে পড়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। একদিকে তাঁরা চা খাওয়ার জন্য কয়েক মিনিট দেরি করেন, অন্যদিকে পুলিশ তাঁদের সামনে যেতে বাধা দেয়। এই দুই ঘটনা একসঙ্গে না ঘটলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারত।
কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা সাধারণ পর্যটন ভ্রমণের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। দীর্ঘ পথ, পাহাড়ি রাস্তা, উচ্চতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং সীমান্তবর্তী এলাকার প্রশাসনিক নিয়ম—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়। কল্যাণকুমারদের যাত্রার ক্ষেত্রেও ভিসা পেতে দেরি এবং বৃষ্টির কারণে রাতের যাত্রা বাতিল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তিত পরিকল্পনাই তাঁদের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাড়িতে ফিরে এসেও অবশ্য পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি কল্যাণকুমার। চোখের সামনে দেখা সেতু ভেঙে পড়ার দৃশ্য, প্রবল জলরাশি, পাথর ও কাদার স্রোত এবং মানুষের অসহায়তা এখনও তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। একইসঙ্গে স্বস্তিও রয়েছে যে তিনি এবং তাঁর সঙ্গী নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যে নিজের নিরাপদে ফিরে আসাকে তিনি নিছক সৌভাগ্য বলেই মনে করছেন।
এই ঘটনার পর পর্যটকদের মধ্যেও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় ভ্রমণের সময় কতটা সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ হল, পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নদী, ঝোরা, সেতু এবং নিচু রাস্তার কাছাকাছি অবস্থান না করা। স্থানীয় প্রশাসন রাস্তা বন্ধ করলে বা এগিয়ে যেতে নিষেধ করলে সেই নির্দেশ অমান্য না করাই নিরাপদ। কারণ হড়পা বান এমন একটি দুর্যোগ, যা অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
বর্ধমানের দুই পর্যটকের অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি রোমাঞ্চকর বেঁচে ফেরার গল্প নয়, বরং প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়তার একটি বাস্তব ছবি। এক কাপ চায়ের জন্য মাত্র কয়েক মিনিটের বিরতি তাঁদের এমন একটি বিপর্যয় থেকে দূরে রাখল, যেখানে চোখের সামনে সেতু, গাড়ি এবং মানুষ ভেসে যেতে দেখেছেন তাঁরা। ভাগ্যের এই অদ্ভুত সমাপতন আজ তাঁদের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলির একটি।
সব মিলিয়ে, কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় বেরিয়ে নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের মুখোমুখি হয়েছিলেন বর্ধমানের কল্যাণকুমার তা এবং তাঁর সঙ্গী বিপ্লব হাজরা। কিন্তু বিদুরের কাছে মাত্র ১৫ মিনিটের চা-বিরতি এবং পরে পুলিশের বাধা তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। সামনে এগিয়ে গেলে তাঁরাও সেই ভয়াবহ স্রোতের মধ্যে পড়তে পারতেন। বাড়ি ফিরে কল্যাণকুমারের বার্তা তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং প্রকৃতিকে সম্মান করে এবং তার সতর্কবার্তা মেনে চলেই মানুষের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।


