কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও জনপথের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রশাসনের দাবি, শহরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে এবং বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিত্বদের যথাযথ সম্মান জানাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য রাস্তার নামের একটি তালিকা তৈরি হয়েছে এবং তা নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র একটি বা দুটি রাস্তা নয়, কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত একাধিক সড়কের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। কোন কোন রাস্তার নাম বদলানো হবে এবং তার পরিবর্তে কী নতুন নাম রাখা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সরকারের বক্তব্য, বহু রাস্তার বর্তমান নাম এমন ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, যা বর্তমান সময়ে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। সেই কারণে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নামে রাস্তার নামকরণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে রাজ্যের ঐতিহ্য ও ইতিহাস আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
তবে এই উদ্যোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, রাস্তার নাম পরিবর্তনের পরিবর্তে নাগরিক পরিষেবা, রাস্তার পরিকাঠামো এবং যানজটের মতো সমস্যার সমাধানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য, শহরের পরিচয় ও ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাস্তার নাম নির্ধারণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাস্তার নাম পরিবর্তন কোনও নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে কলকাতায় বহু রাস্তার নাম পরিবর্তন হয়েছে। কখনও ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি মুছে ফেলতে, আবার কখনও স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী বা সমাজসংস্কারকদের সম্মান জানাতে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমান উদ্যোগও সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করেছেন যে, রাস্তার নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নাম কার্যকর হওয়ার পরে সরকারি নথি, মানচিত্র, ডাক পরিষেবা, জরুরি পরিষেবা, জিপিএস ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সেই পরিবর্তন দ্রুত প্রতিফলিত করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মত, নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনসচেতনতা। নতুন নাম চালু হলে পুরনো নামের সঙ্গে মিল রেখে কিছুদিন নির্দেশিকা বা সাইনবোর্ড ব্যবহার করলে মানুষ সহজেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন। এতে প্রশাসনিক কাজও সহজ হবে।
ঐতিহাসিকদের মতে, একটি শহরের রাস্তার নাম শুধু ঠিকানা নয়; তা শহরের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কোনও নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবদান, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং জনমতের বিষয়গুলিও বিবেচনা করা উচিত।
এদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা সম্পূর্ণ করা হবে। অনুমোদন মিললে ধাপে ধাপে নতুন নাম কার্যকর করা হবে এবং সেই অনুযায়ী সরকারি নথি ও সাইনেজও পরিবর্তন করা হবে।
সব মিলিয়ে, কলকাতার একাধিক রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। এখন নজর থাকবে, কোন কোন রাস্তা এই তালিকায় স্থান পায় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর শহরের নাগরিক জীবনে তার কী প্রভাব পড়ে।


