শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে প্রণীত পকসো (Protection of Children from Sexual Offences Act) আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে কেরল হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, কোনও শিশুর শরীরের **‘চেস্ট’ (বুক)** এবং **‘ব্রেস্ট’ (স্তন)** শব্দদুটির মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পার্থক্য থাকলেও, যৌন নির্যাতনের অভিযোগে আইনি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া যায় না। যদি ঘটনায় যৌন উদ্দেশ্য (sexual intent) স্পষ্ট থাকে, তবে তা পকসো আইনের আওতায় যৌন নির্যাতনের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই পর্যবেক্ষণ একটি ফৌজদারি মামলার শুনানিতে উঠে আসে। মামলায় অভিযোগ ছিল, এক নাবালককে যৌন উদ্দেশ্যে শরীরের উপরের অংশে স্পর্শ করা হয়েছিল। অভিযুক্তের আইনজীবী যুক্তি দেন যে, অভিযোগে ‘চেস্ট’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, ‘ব্রেস্ট’ নয়। তাই পকসো আইনের নির্দিষ্ট ধারায় অপরাধ প্রযোজ্য নয়। তবে আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেনি।
বিচারপতি এ. বদরুদ্দিন (Justice A. Badharudeen) পর্যবেক্ষণে বলেন, অভিধান বা শারীরবিদ্যার বিচারে ‘চেস্ট’ এবং ‘ব্রেস্ট’-এর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বাস্তব প্রেক্ষাপটে শিশুর বক্তব্যকে সাধারণ অর্থেই বিচার করতে হবে। আদালতের মতে, কোনও শিশু যদি জানায় যে অভিযুক্ত তার ‘চেস্ট’ স্পর্শ করেছে এবং সেই স্পর্শের উদ্দেশ্য যৌন হয়, তাহলে সেটিকে কেবল শব্দগত পার্থক্যের ভিত্তিতে অগ্রাহ্য করা যায় না।
আদালত আরও স্পষ্ট করে জানায়, পকসো আইনের মূল লক্ষ্য শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই আইনের ব্যাখ্যা এমনভাবে করা উচিত নয় যাতে শুধুমাত্র ভাষাগত বা প্রযুক্তিগত কারণে অভিযুক্ত অযথা সুবিধা পেয়ে যায়। আদালতের মতে, এই আইনের কেন্দ্রবিন্দু হল **যৌন উদ্দেশ্য** এবং **শিশুর প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ**, নির্দিষ্ট শব্দের ব্যবহার নয়।
তবে একইসঙ্গে আদালত মামলার প্রমাণ পুনর্বিবেচনা করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ‘অ্যাগ্রাভেটেড সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট’-এর পরিবর্তে ‘সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট’-এর অপরাধ প্রযোজ্য বলে সিদ্ধান্ত দেয়। সেই অনুযায়ী সাজাও সংশোধন করা হয়। অর্থাৎ আদালত অপরাধের প্রকৃতি পুনর্মূল্যায়ন করলেও, যৌন উদ্দেশ্যে শিশুর শরীরে স্পর্শ করার অভিযোগকে অস্বীকার করেনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতের পকসো মামলাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে শিশুর বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, সেখানে আদালত ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট, অভিযুক্তের উদ্দেশ্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবে বলে এই রায়ে স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, এই রায় পকসো আইনের মূল উদ্দেশ্যকে আরও শক্তিশালী করেছে। কারণ অতীতে সুপ্রিম কোর্টও বলেছিল, শিশু যৌন নির্যাতনের মামলায় **”sexual intent”**-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কেবল প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা উচিত নয়।
শিশু অধিকার কর্মীদের মতে, এই ধরনের ব্যাখ্যা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও সংবেদনশীল করবে এবং শিশুদের বক্তব্যকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে আদালতের এই অবস্থান ভবিষ্যতে তদন্তকারী সংস্থা ও নিম্ন আদালতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, কেরল হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি মামলার রায় নয়, বরং পকসো আইনের ব্যাখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, শিশু সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে শব্দের আক্ষরিক অর্থের চেয়ে অপরাধের প্রকৃতি এবং যৌন উদ্দেশ্যই আইনি বিচারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।


