পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প **‘মা ক্যান্টিন’**-কে ঘিরে এবার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। হুগলির **তারকেশ্বর পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে** পরিচালিত একটি মা ক্যান্টিনে সরকারি অর্থের অপব্যবহার এবং ভুয়ো হিসাব দেখিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর **রূপা সরকারের** বিরুদ্ধে। অভিযোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই এলাকায় রাজনৈতিক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনের কাছে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মা ক্যান্টিনের দায়িত্ব কাগজে-কলমে একটি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নামে থাকলেও বাস্তবে সমস্ত সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রাক্তন কাউন্সিলর। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিদিন প্রকৃতপক্ষে যেখানে মাত্র **২০ থেকে ৩০ জন** মানুষকে খাবার পরিবেশন করা হত, সেখানে সরকারি নথিতে প্রায় **১৫০ জন উপভোক্তার** হিসাব দেখিয়ে বিল তৈরি করা হতো। এর ফলে প্রকৃত খরচের তুলনায় অনেক বেশি সরকারি অর্থ তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, পুরসভার বরাদ্দের অর্থ প্রথমে সংশ্লিষ্ট স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়লেও পরে সেই টাকা তুলে অন্যত্র হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, **২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রতি মাসে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা** এইভাবে আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং কোনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা এখনও অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করেনি।
এই ঘটনাকে সামনে রেখে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব তারকেশ্বর পুরসভা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তর এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। তাঁদের দাবি, পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহার হয়ে থাকলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদ অনুযায়ী, রূপা সরকারের বিরুদ্ধে জমি দখল সংক্রান্ত অন্য একটি মামলারও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি এলাকায় নেই এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে এই দাবির বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগ জমা পড়ার পর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে। **মা ক্যান্টিন প্রকল্পের নোডাল অফিসার** জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে যদি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
উল্লেখ্য, মা ক্যান্টিন প্রকল্পের লক্ষ্য হল স্বল্পমূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে পুষ্টিকর রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু নিম্নআয়ের মানুষ মাত্র **৫ টাকায়** খাবার পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন। তাই এই ধরনের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিয়মিত অডিট, উপভোক্তার প্রকৃত সংখ্যা যাচাই এবং ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে সরকারি অর্থের অপচয় বা অপব্যবহারের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য এবং নথিপত্র যাচাইয়ের পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তিকে দোষী বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, **তারকেশ্বরের মা ক্যান্টিনে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ** নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন তদন্তের অগ্রগতি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে।


