ভারতীয় রেলের আধুনিকীকরণের পথে একের পর এক নতুন প্রযুক্তির সংযোজন হচ্ছে। একদিকে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিষেবায় সাফল্যের সঙ্গে চলছে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে হাইড্রোজেন ট্রেন চালুর প্রস্তুতিও জোরকদমে চলছে। ফলে অনেক যাত্রীর মনেই প্রশ্ন উঠছে—বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবং হাইড্রোজেন ট্রেনের মধ্যে পার্থক্য কী? ভাড়া, গতি, প্রযুক্তি, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত প্রভাবের দিক থেকে কোন ট্রেন কতটা আলাদা?
বন্দে ভারত এক্সপ্রেস মূলত একটি সেমি-হাই স্পিড ইলেকট্রিক ট্রেন, যা সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎচালিত। এটি ভারতেই তৈরি এবং আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আরামদায়ক যাত্রী পরিষেবার জন্য পরিচিত। অন্যদিকে, হাইড্রোজেন ট্রেন হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলে। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং এর উপজাত হিসেবে মূলত জলীয় বাষ্প নির্গত হয়। ফলে এটি পরিবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি উপযোগী বলে মনে করা হয়।
গতি ও পরিষেবার ক্ষেত্রে বন্দে ভারত বর্তমানে ভারতীয় রেলের অন্যতম দ্রুতগতির ট্রেন। বিভিন্ন রুটে এটি সাধারণত ১৩০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা পর্যন্ত গতিতে চলতে সক্ষম, যদিও ট্র্যাকের অবস্থা অনুযায়ী প্রকৃত গতি নির্ধারিত হয়। হাইড্রোজেন ট্রেনের ক্ষেত্রেও উন্নত গতি সম্ভব হলেও, ভারতে প্রাথমিকভাবে এটি মূলত স্বল্প দূরত্ব বা ডিজেলনির্ভর নন-ইলেকট্রিফাইড রুটে চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ভাড়ার দিক থেকে দুই ট্রেনের সরাসরি তুলনা করা কঠিন। কারণ বন্দে ভারত একটি নিয়মিত যাত্রীবাহী এক্সপ্রেস ট্রেন, যার ভাড়া রুট, দূরত্ব, কোচের ধরন এবং ক্যাটারিং পরিষেবার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়।
অন্যদিকে, হাইড্রোজেন ট্রেন এখনও ভারতে বাণিজ্যিকভাবে নিয়মিত পরিষেবায় চালু হয়নি। ফলে এর নির্দিষ্ট ভাড়া এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। পরিষেবা শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রুট এবং পরিচালন ব্যয়ের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করবে ভারতীয় রেল।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে বন্দে ভারত সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ যেখানে ওভারহেড ইলেকট্রিক লাইন রয়েছে, সেখানেই এটি চলতে পারে। বিপরীতে, হাইড্রোজেন ট্রেনের অন্যতম বড় সুবিধা হল এটি বিদ্যুতায়নবিহীন রেলপথেও চলতে পারে। ফলে দুর্গম বা কম ব্যবহৃত রুটে ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
পরিবেশগত দিক থেকে হাইড্রোজেন ট্রেনকে ভবিষ্যতের পরিবহন প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডিজেল ট্রেনের তুলনায় এটি কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। অন্যদিকে, বন্দে ভারতও বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় ডিজেল ট্রেনের তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের উপর তার পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে।
যাত্রীসুবিধার ক্ষেত্রে বন্দে ভারত ইতিমধ্যেই আধুনিক আসন, স্বয়ংক্রিয় দরজা, জিপিএস-ভিত্তিক তথ্য ব্যবস্থা, বায়ো-ভ্যাকুয়াম টয়লেট, অনবোর্ড ক্যাটারিং এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। হাইড্রোজেন ট্রেনেও আধুনিক সুবিধা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও পরিষেবা শুরু না হওয়া পর্যন্ত এর সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দে ভারত এবং হাইড্রোজেন ট্রেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং ভারতীয় রেলের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য তৈরি দুটি আধুনিক প্রযুক্তি। যেখানে দ্রুত, আরামদায়ক এবং দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রার জন্য বন্দে ভারত উপযুক্ত, সেখানে পরিবেশবান্ধব ও নন-ইলেকট্রিফাইড রুটে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ভারতীয় রেল আগামী কয়েক বছরে আরও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। উচ্চগতির ট্রেন, হাইড্রোজেন প্রযুক্তি, উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং সবুজ জ্বালানির ব্যবহার ভবিষ্যতের রেল পরিষেবাকে আরও নিরাপদ, দ্রুত এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবং হাইড্রোজেন ট্রেন—দুটি প্রযুক্তিরই নিজস্ব বিশেষত্ব রয়েছে। একদিকে বন্দে ভারত দেশের আধুনিক যাত্রী পরিবহনের প্রতীক, অন্যদিকে হাইড্রোজেন ট্রেন ভারতের সবুজ ও টেকসই রেলব্যবস্থার ভবিষ্যৎ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছে।


