‘বন্দে মাতরম্’কে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিসরে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের আসন্ন অধিবেশনে একটি সংশোধনী বিল আনতে চলেছে, যেখানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর অপমান করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে এর গাওয়া বাধাগ্রস্ত করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিলটি সংসদে পাস হলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকতে পারে।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, **Prevention of Insults to National Honour Act, 1971**-এ সংশোধন এনে ‘বন্দে মাতরম্’-কে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’, জাতীয় পতাকা এবং সংবিধানের মতোই আইনি সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার অবমাননার ক্ষেত্রে যে ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে, সংশোধনী কার্যকর হলে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনি সুরক্ষা কার্যকর হতে |
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, ‘বন্দে মাতরম্’ শুধু একটি গান নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অসংখ্য বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী এই গানকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই জাতীয় গানকে আরও শক্তিশালী আইনি মর্যাদা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে সরকার।
প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বা পরিবেশনে বাধা দেন, অনুষ্ঠান বিঘ্নিত করেন অথবা জাতীয় গানকে প্রকাশ্যে অপমান করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবে আইনটি এখনও কার্যকর হয়নি। সংসদের উভয় কক্ষে বিলটি পাস হয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পরই এটি আইনে পরিণত হবে।
রাজনৈতিক মহলেও এই প্রস্তাব ঘিরে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের সমর্থকদের মতে, জাতীয় প্রতীকগুলির মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। তাই জাতীয় গানকেও সমান আইনি সুরক্ষা দেওয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির একাংশের মতে, এই ধরনের আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। ফলে সংসদে বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ‘বন্দে মাতরম্’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত **আনন্দমঠ** উপন্যাসে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং পরে ভারতের জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে গণপরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় যে ‘জন গণ মন’ হবে জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম্’ জাতীয় গান হিসেবে সমান সম্মান পাবে। যদিও এতদিন জাতীয় গানের ক্ষেত্রে পৃথক শাস্তিমূলক আইন ছিল না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশোধনী কার্যকর হলে আদালতকে প্রতিটি ঘটনায় ইচ্ছাকৃত অপমান বা অনুষ্ঠান বিঘ্নিত করার বিষয়টি প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র অভিযোগ উঠলেই শাস্তি হবে না; আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এই সংশোধনী বিল সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। বিলটি সংসদে কীভাবে গৃহীত হয় এবং আলোচনার পর এতে কোনও পরিবর্তন আনা হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ নাগরিকদের। বিলটি আইনে পরিণত হলে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’-এর আইনি মর্যাদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।


