সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ কমাতে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বার্থে ৩০টি অত্যাবশ্যক ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ অনেক বেশি সাশ্রয়ী দামে পাওয়া সম্ভব হবে এবং বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির উপরও লাগাম টানা যাবে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ **ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (NPPA)** একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানায়, জাতীয় ওষুধ মূল্য নির্ধারণ নীতির আওতায় আরও ৩০টি অত্যাবশ্যক ওষুধের মূল্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে এই ওষুধ বিক্রি করা যাবে না।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই তালিকায় এমন একাধিক ওষুধ রয়েছে, যেগুলি প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, সংক্রমণ, ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকলে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে চিকিৎসা পরিষেবার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালের খরচের পাশাপাশি ওষুধের মূল্যও অনেক সময় রোগীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে যাঁদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, তাঁদের মাসিক চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত বহু পরিবারের জন্য স্বস্তির খবর হতে পারে।
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, দেশের প্রত্যেক নাগরিক যাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে পান, সেই লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল লিস্ট অব এসেনশিয়াল মেডিসিনস (NLEM)-এ অন্তর্ভুক্ত ওষুধগুলির মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং রোগীদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।
ওষুধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্য নির্ধারণের ফলে বাজারে একই ধরনের ওষুধের মধ্যে অযৌক্তিক মূল্যবৈষম্য কমবে। পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত একই কার্যকারিতার ওষুধ নির্ধারিত সীমার মধ্যে বিক্রি করতে হবে। ফলে রোগীরা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করেই প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে পারবেন।
এছাড়াও সরকার জানিয়েছে, মূল্য নির্ধারণের পর সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে নতুন মূল্য তালিকা অনুসরণ করতে হবে। কোনও সংস্থা যদি নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এনপিপিএ নিয়মিতভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করবে এবং মূল্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে তদন্ত চালাবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মূল্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেই সঙ্গে ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় মূল্য নিয়ন্ত্রণের পর কিছু সংস্থা উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যার ফলে বাজারে ওষুধের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সরকারকে সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও সমান নজর রাখতে হবে।
এদিকে সাধারণ মানুষের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান সময়ে চিকিৎসার খরচ দ্রুত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও মাসিক চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা হলেও কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও জনমুখী ও সহজলভ্য করতে ভবিষ্যতেও এই ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত ওষুধের মজুত, জেনেরিক ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জনঔষধি কেন্দ্রগুলির সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ৩০টি অত্যাবশ্যক ওষুধের মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর দিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং রোগীরা কতটা সুবিধা পান, সেদিকেই নজর থাকবে সকলের।


