পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, আগামী **১ আগস্ট ২০২৬** থেকে কলকাতা এবং রাজ্যের অন্যান্য অংশের সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলে মিড-ডে মিল সরবরাহের কাজে যুক্ত হবে **ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ISKCON)**। শুধু তাই নয়, প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য মাথাপিছু রান্নার খরচও বাড়িয়ে **৬.৭৮ টাকা থেকে ১০ টাকা** করা হবে। সরকারের দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্কুলপড়ুয়াদের আরও উন্নতমানের ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব হবে।
বিকাশ ভবনে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের, রাজ্যের শিক্ষা দফতরের মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে মিড-ডে মিলের গুণগত মান নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার ইসকনের মতো অভিজ্ঞ সংস্থাকে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, ইসকনের বহু বছরের বৃহৎ পরিসরে খাদ্য পরিবেশনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ইসকন শুধুমাত্র খাবার সরবরাহই করবে না, সংস্থার পক্ষ থেকেও কিছু আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া হবে। ফলে সরকার ও সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ছাত্রছাত্রীরা উন্নত মানের খাবার পাবে। তাঁর দাবি, শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সেই লক্ষ্যেই এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, **PM POSHAN** প্রকল্পের আওতায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য রান্নার খরচ বাড়িয়ে প্রতিদিন মাথাপিছু ১০ টাকা করা হবে। অতিরিক্ত **৩.২২ টাকা** সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকার বহন করবে। এর ফলে খাবারের গুণগত মান আরও উন্নত হবে বলে প্রশাসনের আশা।
শুধু মিড-ডে মিল নয়, রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্যও একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় **৮১ হাজার স্কুলে** দ্রুত কম্পোজিট গ্র্যান্ট পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে স্কুলগুলিতে গ্যাসে রান্নার ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং ভবিষ্যতে সৌরশক্তির ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। স্কুলগুলিতে বিশুদ্ধ পানীয় জল, পরিষ্কার শৌচাগার এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বাসনপত্র নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এছাড়াও গরমপ্রবণ জেলা যেমন বীরভূম, বাঁকুড়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামের স্কুলে অতিরিক্ত ফ্যান বসানোর কথা জানানো হয়েছে। মেয়েদের স্কুল এবং সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন ও অ্যাকোয়াগার্ড বসানোর পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে সরকার। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছ |
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্য সরকার জাতীয় শিক্ষা নীতির (NEP) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত অবস্থানের কারণে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অনেক আর্থিক সুবিধা রাজ্য পায়নি। এখন সেই সমস্যার সমাধান হওয়ায় দ্রুত কেন্দ্রীয় অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে স্কুলগুলির উন্নয়নমূলক কাজ আরও গতি পাবে।
শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী স্বচ্ছতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না এবং শুধুমাত্র মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ করা হবে। সংরক্ষণ নীতিও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ফি কাঠামো এবং নিয়মকানুনও পর্যালোচনা করা হবে, যাতে শিক্ষা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত না হয়।
তবে ইসকনকে মিড-ডে মিল প্রকল্পে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতেও আলোচনা হয়েছে এবং অতীতে রাজ্য সরকার জানিয়েছিল যে ইসকনের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব এলেও তখনও কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। এবার সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আগামী ১ আগস্ট থেকে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর হতে চলেছে। মিড-ডে মিল প্রকল্পে ইসকনের অংশগ্রহণ, ছাত্রপিছু বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা পরিকাঠামোর উন্নয়নের একাধিক পরিকল্পনা—সবকিছু মিলিয়ে সরকারের লক্ষ্য শিশুদের আরও পুষ্টিকর খাবার, উন্নত পরিবেশ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এখন নজর থাকবে এই ঘোষণাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত এবং কতটা সফলভাবে কার্যকর করা যায় তার উপর।


