কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদকে ঘিরে বিতর্ক নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, সম্প্রসারণ পরিকল্পনা এবং ধর্মীয় স্থাপনার ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁর মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম যাতে কোনওভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে প্রশাসনের বিশেষ নজর থাকা উচিত। সেই কারণেই প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনাটি উপযুক্ত নিয়ম মেনে অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, কলকাতা বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার মধ্যে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা জটিলতার কারণে ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। সম্প্রতি নিরাপত্তাজনিত কারণে মসজিদে প্রবেশও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রী নিরাপত্তা এবং বিমান চলাচলের স্বার্থে অপারেশনাল এলাকার প্রতিটি অংশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অতীতে পরিচয়পত্র দেখিয়ে বহু মানুষ ওই এলাকায় প্রবেশ করতেন। কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুযায়ী সেই ব্যবস্থা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলেই কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
শুভেন্দু অধিকারী আরও ইঙ্গিত দেন, উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হবে। তিনি বলেন, সরকার কোনও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করতে চায় না। তবে জনস্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উন্নয়নের প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
সূত্রের খবর, বহু বছর ধরেই বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পে এই মসজিদের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। অতীতেও একাধিকবার স্থানান্তরের আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার নতুন করে বিষয়টি সামনে আসায় প্রশাসন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে পাল্টা প্রতিক্রিয়া। বিরোধীরা বিষয়টিকে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে তুলে ধরলেও রাজ্য সরকারের দাবি, এটি কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং সম্পূর্ণভাবে নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রশাসনিক বিষয়।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর পরিচালনা করতে গেলে অপারেশনাল এলাকার নিরাপত্তায় কোনওরকম আপস করা যায় না। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে কিংবা নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে সাধারণ মানুষের নিয়মিত যাতায়াত থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই বিশ্বের বহু বিমানবন্দরে সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থাপনা স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে ধর্মীয় স্থাপনা স্থানান্তরের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা এবং আইনগত প্রক্রিয়া মেনেই এগোনো উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে একদিকে যেমন উন্নয়নের কাজ এগোবে, অন্যদিকে সামাজিক সম্প্রীতিও বজায় থাকবে।
সব মিলিয়ে কলকাতা বিমানবন্দরের মসজিদকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন রাজ্যের অন্যতম আলোচিত ইস্যু। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যের পর বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেলেও, শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা নির্ভর করবে প্রশাসন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আলোচনার উপর। আপাতত নিরাপত্তা, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং ঐতিহ্য রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


