নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। এবার ফের অস্বস্তি বাড়াল ডিমের দাম। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন বাজারে গত কয়েকদিনে ডিমের খুচরো মূল্য আবারও বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাসিক খাদ্য বাজেটে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। যে ডিম এতদিন তুলনামূলকভাবে সস্তায় প্রোটিনের অন্যতম উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটিই এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন এলাকায় এক একটি ডিমের দাম ৮ থেকে ৯ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অনেক জায়গায় ৩০টি ডিমের একটি ট্রের দাম ২২০ থেকে ২৪০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল অনেকটাই কম। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি চোখে পড়েছে।
ডিম ব্যবসায়ীদের একাংশ জানিয়েছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, উৎপাদনকারী রাজ্যগুলিতে অতিরিক্ত গরমের প্রভাব পড়েছে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে মুরগির ডিম উৎপাদন কমে যায়। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়তে শুরু করে।
এছাড়াও পরিবহণ খরচও বেড়েছে। ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক ব্যয়ের চাপ সরাসরি ডিমের পাইকারি দামে প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন কেন্দ্র থেকে কলকাতার বাজারে ডিম পৌঁছে দিতে আগের তুলনায় বেশি খরচ হচ্ছে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
শুধু পরিবহণ নয়, পোলট্রি শিল্পে ব্যবহৃত খাদ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভুট্টা, সয়াবিন এবং অন্যান্য খাদ্য উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি ওষুধ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সমস্ত কারণ মিলিয়েই ডিমের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত গ্রীষ্মকালে ডিমের চাহিদা কিছুটা কম থাকে। তাই এই সময়ে দামও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার কথা। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রম। উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার ফলে চাহিদা কম থাকলেও দাম নিম্নমুখী হয়নি। বরং বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত ডিম কিনে থাকেন, তাঁদের মাসিক খরচ বেড়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, আগে সপ্তাহে দুই বা তিন ট্রে ডিম কেনা হলেও এখন খরচ সামলাতে পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। ছাত্রছাত্রী, কর্মজীবী মানুষ এবং শিশুদের পুষ্টির জন্য যাঁরা নিয়মিত ডিমের উপর নির্ভর করতেন, তাঁদের কাছেও এই মূল্যবৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মতে, পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এখনই নেই। উৎপাদন বাড়তে শুরু করলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে এলে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। তবে জ্বালানির দাম ও পোলট্রি খাদ্যের মূল্য যদি বর্তমান অবস্থায় থাকে, তাহলে বাজারে ডিমের দাম খুব দ্রুত কমবে—এমন আশা করা কঠিন।
পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার পরিস্থিতির উপর প্রশাসনিক নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে, কলকাতায় ফের ডিমের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ব্যয় আরও বেড়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির উপরই নির্ভর করবে এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী হবে। বর্তমানে বাজারের গতিপ্রকৃতি দেখে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং ক্রেতারাও প্রতিদিনের দামের ওঠানামার দিকে নজর রাখছেন।


