তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এর্দোগান ফের রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুললেন। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে সওয়াল করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে কাশ্মীর সমস্যার কথাও উঠে আসে। এর্দোগান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সমস্ত বিরোধের পাশাপাশি কাশ্মীর সমস্যারও রাষ্ট্রসংঘের সনদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের কাঠামোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা গুরুত্বপূর্ণ।
এর্দোগানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ভারত দীর্ঘদিন ধরেই কাশ্মীর প্রশ্নে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। নয়াদিল্লির অবস্থান অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অংশ এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যেকোনও দ্বিপাক্ষিক বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। ফলে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ফের কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলার ঘটনা কূটনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
### রাষ্ট্রসংঘে কী বললেন এর্দোগান?
নিজের ভাষণে এর্দোগান দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে কাশ্মীর সমস্যাকে অন্যান্য বিরোধের সঙ্গে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—আঞ্চলিক বিরোধগুলি আলোচনার মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রসংঘের সনদ ও সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের কাঠামোর মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট সমাধান বা মধ্যস্থতার প্রস্তাব না দিয়ে তিনি মূলত সংলাপ ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর কথা বলেন।
তবে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। এর্দোগান যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, সেই সময় রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও উপস্থিত ছিলেন। ফলে তুরস্কের এই বক্তব্যকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেই দেখা হচ্ছে।
কাশ্মীর ছাড়াও এর্দোগানের রাষ্ট্রসংঘের ভাষণে গাজা, প্যালেস্টাইন এবং রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের মতো বিষয় উঠে আসে। তিনি গাজায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান এবং প্যালেস্টাইনকে আরও দেশ স্বীকৃতি দিক—এমন অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
### কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থান কী?
কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট। নয়াদিল্লি এই বিষয়টিকে ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখে এবং তৃতীয় কোনও দেশের মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে। ভারতীয় কূটনীতিকদের বক্তব্যে বারবার বলা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত বিষয় এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত।
এর আগে তুরস্কের কাশ্মীর-সংক্রান্ত মন্তব্যের বিরুদ্ধেও ভারত আপত্তি জানিয়েছে। ২০২০ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এর্দোগান জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে মন্তব্য করার পর ভারতের তৎকালীন স্থায়ী প্রতিনিধি টি এম তিরুমূর্তি তুরস্কের অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন। ভারতের বক্তব্য ছিল, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়কে সম্মান করা প্রয়োজন।
২০২৫ সালেও কাশ্মীর প্রসঙ্গে এর্দোগানের মন্তব্য নিয়ে ভারত ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই সময় ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছিলেন, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন হয়নি এবং ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই।
### ২০২৪ সালে কেন আলাদা ছিল এর্দোগানের অবস্থান?
এর্দোগানের কাশ্মীর-সংক্রান্ত বক্তব্য অবশ্য প্রতি বছর একই রকম ছিল না। ২০২০ এবং পরবর্তী কয়েকটি রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনে তিনি কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুললেও ২০২৪ সালের রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে জম্মু ও কাশ্মীরের উল্লেখ করেননি। ২০২৫ সালে ফের বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে ফিরে আসে। এবার ২০২৬ সালের ভাষণেও কাশ্মীর প্রসঙ্গ স্থান পেল।
ফলে সাম্প্রতিক বক্তব্যকে তুরস্কের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে এবারের বক্তব্যে এর্দোগান মূলত সংলাপ এবং রাষ্ট্রসংঘের কাঠামোর মধ্যে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাই বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের কাশ্মীর-সংক্রান্ত অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে—বিশেষ করে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা এবং বিষয়টির আন্তর্জাতিকীকরণ নিয়ে।
### তুরস্ক-পাকিস্তান সম্পর্কও আলোচনায়
এর্দোগানের বক্তব্যের পর তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি বছরের ৭ আগস্ট তুরস্ক, পাকিস্তান এবং সৌদি আরব মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করার কথা বলা হয়েছে। এর্দোগানের সাম্প্রতিক কাশ্মীর মন্তব্য সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই এসেছে।
তবে কাশ্মীর প্রসঙ্গে তুরস্কের বক্তব্যকে সরাসরি কোনও নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য এখনও সামনে আসেনি। এর্দোগানের বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু নতুন কোনও নির্দিষ্ট মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া বা প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে এর্দোগানের কাশ্মীর মন্তব্য ভারত-তুরস্ক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে তুরস্ক আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের কথা বলছে, অন্যদিকে ভারত বরাবরের মতোই বিষয়টিতে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করছে। ফলে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে উচ্চারিত এই বক্তব্য নতুন কোনও সমাধানসূত্র তৈরি করেছে কি না, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুই দেশের অবস্থানের এই মৌলিক পার্থক্য।


