ডিসেম্বরে আমেরিকায় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত হতে চলা জি-২০ লিডার্স সামিটকে কেন্দ্র করে এই সম্ভাব্য সফরের খবর সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা ওই সম্মেলনে যোগ দেবেন বলে জানা গিয়েছে। মোদির সফর এখনও ভারত সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে সম্মেলনের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত সূত্রের বরাত দিয়ে একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর সম্ভাব্য আমেরিকা সফরের কথা জানানো হয়েছে।
ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিতব্য এই জি-২০ সম্মেলন এবার ভারত-মার্কিন সম্পর্কের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মোদি আমেরিকা গেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে। ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য, শুল্ক, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠক হলে আলোচনার পরিধি আরও বাড়তে পারে।
তবে এখনও পর্যন্ত মোদির সফর কিংবা সম্ভাব্য মোদি-ট্রাম্প বৈঠক নিয়ে নয়াদিল্লির তরফে কোনও সরকারি ঘোষণা করা হয়নি। সাধারণত রাষ্ট্রনেতাদের বিদেশ সফরের বিষয়ে সরকার নির্দিষ্ট সময়ের কাছাকাছি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে। তাই আপাতত সফরটিকে সম্ভাব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আমেরিকার প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ডিসেম্বরের জি-২০ সম্মেলনে মোদির উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
এই সম্ভাব্য বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক। রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ দেওয়া একটি মার্কিন বিল নিয়ে ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারত রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে এবং সেই কারণেই প্রস্তাবিত মার্কিন পদক্ষেপ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার তেল নিয়ে ভারতের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে স্পষ্ট। নয়াদিল্লি বারবার জানিয়েছে, দেশের বিপুল জনসংখ্যার জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া থেকে কম দামে অপরিশোধিত তেল কেনার ফলে ভারতের জ্বালানি আমদানির খরচ নিয়েও সুবিধা হয়েছে বলে ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন রাশিয়ার জ্বালানি খাতের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে চাপ বাড়িয়েছে। ফলে বাণিজ্য আলোচনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে সম্ভাব্য মোদি-ট্রাম্প বৈঠক হলে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিলেন, দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে এবং আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জি-২০ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নয়, জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে কোয়াড নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ভারত, আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার এই চার দেশের কৌশলগত জোট ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে জি-২০ সম্মেলনের সময় কোনও পৃথক কোয়াড বৈঠক হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে এই বিষয়টিও আপাতত সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।
মোদির সম্ভাব্য আমেরিকা সফরের সঙ্গে কানাডা সফরের কথাও সামনে এসেছে। জি-২০ সম্মেলন শেষ করার পর প্রধানমন্ত্রী কানাডা যেতে পারেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ভারত ও কানাডার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে এবং দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ম্যানিন্দর সিধু সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে ভারত-কানাডা Comprehensive Economic Partnership Agreement বা CEPA নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছনোর বিষয়ে তাঁর দেশ আশাবাদী।
কানাডার সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো ক্ষেত্রগুলিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কানাডার পক্ষ থেকে ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য এলএনজি প্রকল্পে বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি খাতে সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। ফলে মোদির সম্ভাব্য কানাডা সফর হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
অন্যদিকে, জি-২০ সম্মেলন নিজেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলির রাষ্ট্রনেতারা এই সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। চলতি বছরে বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সম্মেলনের আলোচনাও বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত কয়েক মাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের চাপ দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিসেম্বরে মোদি আমেরিকা গেলে সম্ভাব্য বৈঠকে একাধিক দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
মোদি ও ট্রাম্পের শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল জুন মাসে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে। সেই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন অব্যাহত থাকায় ডিসেম্বরের সম্ভাব্য বৈঠকটি সেই আলোচনাগুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরের জি-২০ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য আমেরিকা সফর এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়। ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হলে বাণিজ্য, রাশিয়ার তেল, শুল্ক, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো বিষয় উঠে আসতে পারে। একই সফরে কানাডা যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যেখানে দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে। তবে সফর ও বৈঠক—দুটিই এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায়। তাই আগামী দিনে নয়াদিল্লির সরকারি ঘোষণা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক প্রস্তুতির দিকেই নজর থাকবে।


